Friday, October 10, 2014

উত্তর কলকাতার দে-মল্লিক বাড়ির সুপ্রাচীন কুলদেবী শ্রী শ্রী সিংহবাহিনী মাতার পূজার বর্ণনা ও ইতিহাস

ভূমিকা 

২০১৩ সালের আনন্দবাজার পত্রিকার ৭ অক্টোবরের 'কলকাতার কড়চা ' বিভাগের এক প্রতিবেদনে সর্বপ্রথম উত্তর কলকাতায় বাংলার দে-মল্লিক পরিবারের  এক সুপ্রাচীন কুলদেবী  সিংহ বাহিনী মাতার পূজার কথা জানতে পেরেছিলাম। ওই সূত্রে আরও জানতে পেরেছিলাম যে ওই বছরে এই  চারশো বছরের পূজা উপাসনা সম্পন্ন হবে ৩৯ নম্বর জ্যোতিন্দ্রমোহন এভেনিউএর  হেমেন্দ্রমোহন মল্লিকের বিশাল বাসভবনে।  খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছিলাম যে, এই স্থানটি অরবিন্দ সরণি ও জ্যোতিরিন্দ্রমোহন এভিনিউ র  সংযোগস্থলের কাছাকাছি।

দেবীদর্শন 

আমরা উত্তর কলকাতার বনেদী বাড়ির পূজাপরিক্রমা চলাকাকীন  ঠনঠনিয়ার দ্বারিকাভবনের দত্তবাড়ির প্রতিমা দর্শন সমাপ্ত করে মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট ধরে চিত্তরঞ্জন এভিনিউ ধরে  দিকে কিছুটা এগোতেই অরবিন্দ  সরণির অদূরে সুসজ্জিত হেমেন্দ্র মল্লিকের বাসভবন সহজেই পেয়ে গেলাম। বাড়িতে প্রবেশ করার সময়ে ওদের সুসজ্জিত প্রবেশদ্বার দিয়ে ভিতরে  ঢুকেই  মনে হলো এক স্বপ্ন পুরিতে এসে পড়েছি।



আগে এই উত্তর কলকাতার অনেক বনেদী বাড়িতে গেছি, কিন্তু কোথাও  এরকম পেশাদারীত্বের সঙ্গে বনেদিয়ানার মেলবন্ধন  দেখি নি।  ভিতরের প্রশস্ত পূজাপ্রাঙ্গন বহু লোকের ভিড়ে এবং মায়াময় পরিবেশে খুবই সুন্দর লাগছিল।  প্রাঙ্গনের  চতুর্দিকে এবং নিচ থেকে উপরে মৃদু আলোতে এবং অপরূপ অঙ্গসজ্জায় সজ্জিত ছিল।  






ভিড় এড়িয়ে সিংহবাহিনী  দেবীর পূজামন্ডপে হাজির হলাম। এক হাত প্রতিমা অষ্টধাতুময় চতুর্ভুজা শ্রী শ্রী সিংহবাহিনী দেবীমাতাকে  পুষ্হ্পমাল্যের মধ্যে আবৃত দেখলাম। শুভ্র ধাতুর সিংহাসনের উপরে নীল চাঁদোয়ার নিচে সগৌরবে বিরাজমান এই দেবী।  এই দেবীমূর্তি হস্তিমুণ্ড পারিপদ রক্ষা করে সিংহপৃষ্ঠাধিষ্ঠিত  শঙ্খ -চক্র -ধনুর্বাণ ধারণ করে আছেন।  শিরোশোভা  ধাতুময় পঞ্চমুন্ড রজতকিরীট ,ধাতুময় বস্ত্রদ্বারা আবৃতা।   





পূজামন্ডপের  সবকিছুতেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও নিপূণ পেশাদারিত্বের ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়।  
দেবীর দক্ষিণ পার্শ্বে রক্তবসনাবৃত নবপত্রিকা এবং বাম পার্শ্বে লাল পাড়  শাড়িতে আবৃত লক্ষ্মীর ঝাঁপি দেখতে পাওয়া যায়।  ওই ঝাঁপিতে সোনার চোখ ও সোনার  নাক দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল।   এটি সুবর্ণ বনিক সম্প্রদায়ের একটি প্রচলিত রেওয়াজ। অন্য বাড়িতেও এরূপ রেওয়াজ চোখে পড়েছিল।  



প্রতিমা প্রবেশের মুখে দুটি সুন্দর ভেনাসের প্রতিমূর্তি রাখা রয়েছে।  মৃদু স্বরে  সঙ্গীতের  মূর্ছনা  এক  স্বর্গীয়  পরিবেশের সৃষ্টি করেছিল।  
আমার কন্যাসমা  এক পরিচিত বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম যে এই সিংহবাহিনী মাতার এক সুপ্রাচীন ইতিহাস আছে।  এছাড়া এই দেবীর পূজার সাথে এই -মল্লিক পরিবারের এক সুদীর্ঘ সম্পর্কেরও  এক যোগাযোগ রয়েছে। এই বাড়িতে পূজার সমস্ত পরিচালনা বাড়ির প্রবীণ  সদস্যেরা সুন্দরভাবে সম্পন্ন   করছিলেন।  এই মন্ডপে  নামমাত্র মূল্যে এই সিংহ বাহিনী  দেবীর পূজার ইতিহাস ও দে-মল্লিক বাড়ির সঙ্গে এই পূজার যোগাযোগ সম্বলিত একটি তথ্যপুস্তিকা  অভ্যাগত অতিথিদের বিতরণ করা হচ্ছিল। মন্ডপ থেকে বেরোনোর আগে প্যাকেটে করে ভোগ সামগ্রী দর্শকদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন এক বর্ষীয়ান  ভদ্রলোক।  

হেমেন্দ্র মল্লিকের  বাড়িতে চারশো বছরের পূজার বিশেষত্ব 

দে -মল্লিক বংশের শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী দেবীর প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত শ্রী বৈদ্যনাথ মল্লিকের পরিবার  চারশো বছরে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।  এখন এদের প্রায় সর্বসমেত ৪৫০ শরিক রয়েছে। প্রতিবছরে নতুন নতুন শরিকের বাড়িতে পালা করে এই দেবীমাতার পূজা করা হয়ে থাকে।  এবারে এই পূজার চারশো বছরের পূর্তি উপলক্ষে হেমেন্দ্র মল্লিকের বাড়ি পছন্দ করার অনেকগুলি কারণ রয়েছে।  প্রথমত হেমেন বাবুর বাড়িতে এক বিশাল পরিসরের বনেদী ঠাকুর দালান রয়েছে।  এই দেবী মাতার  পূজার বিশেষ বছরে মহাসমারহে অত্যধিক সংখ্যক অতিথি অভ্যাগত ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে  আদর অভ্যর্থনা এখানেই করা সম্ভবপর ছিল।  হেমেন বাবুর  বাড়িতে শেষবার ১৯৯২ সালে এই দেবীমাতার পূজা সম্পন্ন হয়েছিল।  এই বাড়ির মেয়ে ও বৌয়েরা যাদের গত এক দশকের মধ্যে বিয়ে হয়েছে তাঁরা এই বছরে সর্বপ্রথম  এই বাড়িতে পূজা হওয়াতে আনন্দে আত্মহারা।  সবাই অতিথি অভ্যাগতদের আদর যত্নে আত্মহারা  ছিলেন।  
হেমেন বাবু এই দেবীমাতার বড়বাজারের বিলাস রায় কাটরায় অবস্থিত দেবোত্তর সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে নিযুক্ত আছেন।  

এই শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী দেবীমাতার বিসর্জন হয় না।  বিজয়া দশমীর প্রথাগত বিসর্জনের পরেই এই দেবীমাতা অন্য এক শরিকের বাড়িতে  তাঁর সিংহাসন সমেত চলে যান।  সেখানেই এই দেবীমাতার নিত্যপূজা অনুষ্ঠিত হয় সকাল ও সন্ধ্যাতে।  হেমেন মল্লিকের বাড়ির এক প্রতিনিধি সূত্রে জানা   গেছে যে এই দেবীমাতা সারা বছর  বিভিন্ন শরিকের বাড়িতে পালা করে নিত্য পূজিতা হন।  
 গতবছরে সপ্তমীর দিন  সকালে এই দেবীমাতা শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনীকে  শোভাযাত্রা সহকারে  হাঁসপুকুরের এক শরিকের বাড়ি থেকে হেমেন মল্লিকের বাড়িতে আনা হয়েছিল।  ষষ্ঠীর দিন রাত্রে ঘটে দেবীর বোধন সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।  মল্লিক বাড়ির লোকেরা বৈষ্ণব  ধর্মাবলম্বী হলেও শাক্ত মতে দেবীমাতার পূজা সম্পন্ন হয়।  পূজার তিন দিন অর্থাত  সপ্তমী,অষ্টমী ও নবমী  তে প্রতিবছর পাঠা বলি দেওয়া হয়।  কিন্তু এই  মাংস বাড়ির লোকেরা স্পর্শ করেন না।  দেবীমাতার অন্নভোগ হয় না।  নানা রকমের ফল ও মিঠাই ছাড়া বিভিন্ন রকমের ভাজা খাবার যথা লুচি, সিঙ্গারা, কচুরী  ইত্যাদি ভোগ হিসাবে দেবীমাতাকে নিবেদন করা হয়।  ভোগের দ্রব্যসামগ্রীতে কোন নুন, ঝাল বা টমেটো ব্যবহার করা হয় না. তবুও ভোগের স্বাদ খুবই সুস্বাদু হয়।  

  বাড়ির মহিলারা পূজার সময় সাবেকি গহনা দিয়ে নিজেদের সুসজ্জিত করেন। বাড়ির একজন বয়স্কা মহিলার কথাতে জানা গেল  যে পূজার সময় তাঁরা কোমরে বিছে  গোট , নাকে বড় নথ ,হাতে নানা বর্ণের রুলি ও পায়ে মল পড়েন।  মহাষ্টমীর  সন্ধিপূজার সময় বাড়ির সধবা মহিলারা লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে ধুনা পোড়ানোর অনুষ্ঠানে যোগদান করেন।  
২০১৪ সালে এই শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী দেবীমাতার পূজার পালা পড়েছে   এদের অন্য এক শরিক প্রয়াত  কাশীনাথ মল্লিকের সিন্দুরিযাপট্টিতে অবস্থিত ঠাকুরবাড়িতে। প্রয়াত কাশীনাথ মল্লিক ছিলেন ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণের পরম ভক্ত। এই ঠাকুরবাড়িতে দেবী সিংহ বাহিনীর মূর্তি দর্শন  উপলক্ষে ঠাকুর শ্রী  রামকৃষ্ণ শুভাগমন করেছিলেন। ২০১৪ সালে কাশীনাথ মল্লিকের বর্তমান প্রজন্ম  শ্রী বৈদ্যনাথ মল্লিকের ১৪২ মহাত্মা গান্ধী রোডের বাড়িতে এবারে দেবীমাতার পূজার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি মহাত্মা গান্ধী রোড ও রবীন্দ্র সরণির  সংযোগস্থলে রাস্তার ওপরেই লোহার  ফটকওয়ালা  বাড়ি।  

শ্রী শ্রী সিংহবাহিনী দেবীমাতার ইতিহাস ও দে-মল্লিক বাড়ির সহিত সম্পর্ক 

দেবীমাতা শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনীর এক চমকপ্রদ ইতিহাস আছে।  এই দেবী মূর্তির অর্চনার সঙ্গে এই দে-মল্লিক পরিবারের  সম্পর্ক অতি সুপ্রাচীন, আনুমাণিক চারশো বছরের।  
প্রাচীন ইতিহাস গবেষণা ও পর্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায়  যে,আনুমাণিক ইংরাজী ৬০০ খ্রীস্টাব্দে বৈশ্য বংশীয়  পূশ্যভুতির বংশধর রাজা হর্ষবর্ধনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজা রাজ্যবর্ধন দেবের কুলদেবী ছিলেন এই দেবীমাতা শ্রী শ্রী সিংহবাহিনী।  বৈশ্য  কুলদেবী এই দেবীমাতাকে এক সময় জয়পুর রাজ ভগবানদাসের ভ্রাতুষ্পুত্র মহারাজ মানসিংহ  ছলে, বলে, কৌশলে ও নীতিবহির্ভূত কোনো   উপায়ে  অপসারিত করে নিজ গৃহে তাঁর গৃহদেবতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।  কথিত আছে যে রাজা মানসিংহের মৃত্যুর পরে পূজার দায়িত্বে থাকা ব্রাহ্মণ পুজারী মুসলমান নবাবের হাত থেকে রক্ষা করার   জন্যে  দেবী সিংহবাহিনীর মূর্তি নিয়ে অধুনা বাংলা দেশের চট্টগ্রামে চলে যান এবং ওখানের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের  গুহায় নির্জনে পূজা করতে  থাকেন।  

     এবারে এই দে -মল্লিক বংশের  পূর্ব ইতিহাস শোনা গেলে এদের সহিত শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী মাতার পূজার সম্পর্ক বুঝতে সহজ হবে।  বর্তমানে শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী দেবীমাতা কলকাতার অতি প্রাচীন বাংলার শ্রীসম্পন্ন ও খ্যাতনামা গৌতম গোত্রীয়  দে- মল্লিক বংশের কুলদেবী।  প্রাচীন ঐতিহ্যময় এই সুবর্ণ বণিক পরিবারটির জাতিগত পদবী 'দে।' এই বৈশ্য বংশের উত্পত্তি  অযোধ্যা প্রদেশের রামগড় নগরে।  বংশের আদি পুরুষ  সোমভদ্র দে'র স্বর্ণ ব্যবসা  ছিল।  তারপর দীর্ঘ দিনের ব্যবধানে  প্রায় -দশম দ্বাদশ উত্তর  পুরুষ পরে মুসলিম রাজত্বে 'মল্লিক' উপাধি অর্জিত হয়।  সম্রাট আকবরের  রাজত্বকালে এই পরিবারের অন্যতম পূর্বপুরুষ বনমালী মল্লিক হুগলী জেলার ত্রিবেণী তীরে সুবিশাল জমিদারির পত্তন করেন।  বনমালী মল্লিক এই জমিদারী থেকে প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী হন।  নদীয়া জেলার 
 কাঁচরাপাড়ায়  তাঁর একটি আবাদ ছিল।  এই আবাদের পাশে তিনি খাল কাটিয়েছিলেন।  এই খালটি আজও 'মল্লিক খাল' বলে পরিচিত।  তাঁরই সুযোগ্য পুত্র বৈদ্যনাথ মল্লিক স্বপ্নাদেশে শ্রী শ্রী সিংহবাহিনী দেবীমাতা  প্রাপ্ত হন।  

    আনুমাণিক ১০২০ বঙ্গাব্দে এই মল্লিক বংশের পূর্বপুরুষ শ্রী বৈদ্যনাথ মল্লিক কর্মান্তরে  বাংলা দেশের ঢাকা শহরে গমন করেন।  সেইখানে তিনি আদিম পূর্বপুরুষ বৈশ্য রাজা রাজ্যবর্ধন দেবের কুলদেবী শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনীর    মাহাত্ম্য ও অনন্যসাধারণ  মহিমার কথা শুনতে   পান।  তিনি আরও অবগত হন যে শ্রী শ্রী দেবীমাতা  মহারাজা মানসিংহের পুজারী কর্তৃক  চট্টগ্রাম পাহাড়ের গুহামধ্যে গোপনে পূজিতা হচ্ছেন।  তিনি ততক্ষনাত দেবীদর্শনের মানসে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গমন করেন  এবং সেখানে দেবী কর্তৃক সাধু ও নিজে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে দেবীমাতা প্রাপ্ত হন এবং স্বদেশে সপ্তগ্রামে নিয়ে আসেন।  

      শুভ গোবিন্দ দ্বাদশী তিথিতে দেবীমাতা শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী মল্লিক বংশে প্রতিষ্ঠিতা হন।  বিগত চারশো বছর এই পরিবার  সগৌরবে এই  পূজা করে আসছেন।  সরস্বতী নদী মজে যাওয়াতে ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে যুক্ত জাহাজাদির চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে  সপ্তগ্রামের পতন ঘটে।  অন্যদিকে কলকাতা নগরীর  শ্রী সম্পদ  বৃদ্ধির সঙ্গেসঙ্গে এই মল্লিক পরিবার  স্থায়ীভাবে কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলে ব্যবসা এবং বসবাসের জন্যে চলে আসেন।  সেই  অবধি দেবীমাতা শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী   কলিকাতা নগরে অধিষ্ঠিতা আছেন।  

   এবারে এই দেবীমাতা শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী মূর্তির কিছু বর্ণনা দেওয়া যাক।  এক হস্ত পরিমিত  অষ্টধাতুময় চতুর্ভূজা  শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী দেবীমূর্তি  হস্তীমুন্ড পারিপদ রক্ষা করে  সিংহ পৃষ্ঠস্থিতা  শঙ্খ -চক্র-ধনুর্বাণ  ধারণ করে আছেন।    শিরোশোভা ধাতুময়  পঞ্চমুন্ডময়  রাজকিরীট ,ধাতুময় বস্ত্রদ্বারা আবৃতা।  উল্লেখিত ধাতুময় বস্ত্রে  খোদিত নানারূপ কারুকার্য  ও তত্সঙ্গে রাজা রাজ্যবর্ধন ও হর্ষবর্ধনের সময়ে প্রচলিত ভাষার অক্ষরে খোদিত ছিল।  তেজময়ী দীপ্তি-বিস্ফোরিতা ত্রিনয়ন -বাত্সল্য ও দৃঢ়তায় পরমাজ্জ্বল, শ্রী শ্রী সিংহ বাহিনী  দেবীমাতা গঠনে বঙ্গদেশীয় অন্যান্য দেবীমূর্তির সহিত  সাদৃস্যবিহীন।     

Sunday, September 14, 2014

পূণ্যভূমি দক্ষিণ পাসাডেনার বিবেকানন্দ হাউস -দ্বিতীয় পর্ব

ভূমিকা 

স্বামী বিবেকানন্দের দক্ষিণ পাসাডেনার ৩০৯ নম্বর মন্টেরী রোডে অবস্থিত মীড ভগিনীদের বাসভবনে আগমনের ঘটনা এবং কালক্রমে সেই বাসভবনের  পুণ্য স্মৃতি হিসাবে বিবেকানন্দ হাউস নামে পরিচিত হবার বিশদ বিবরণ আগের পর্বে আলোচিত হয়েছে। এই পর্বে এই বাসভবনে অবস্থানকালীন স্বামীজীর সমস্ত কিছু কার্যকলাপ ,তাঁর খাওয়া দাওয়া , পোশাক- আশাক, সবাইয়ের সাথে বাড়ির একজন লোকেদের মত চাল চলনের কথা বিশদ ভাবে আলোচনা করার প্রয়াস করব।  এই সমস্ত থেকে স্বামীজীর সম্বন্ধে পাঠক কুলের একটি অন্যরূপ ধারণা প্রকাশ পেতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।  

    মন্টেরী  রোডের রাস্তার বিপরীত থেকে বিবেকানন্দ হাউসের দৃশ্য



স্বামীজী যখন মীড ভগিনীদের বাড়িতে আগমন করলেন সেই সময়ে ওই বাসভবনে মীড পরিবারের অনেক সদস্য থাকতেন। এরা  হলেন পরিবারের কর্তা মি: জেস মীড ,তাঁর তিন মেয়ে ,তাঁর দুই নাতি-নাতনি -মিসেস হ্যান্সব্রো -র চার বছরের  মেয়ে ডরোথি আর মিসেস ওয়াইকফের সতের বছরের ছেলে রাল্ফ ; আর ছিল বাড়ির দেখাশোনা করার লোক মিস ফেয়ারব্যাংকস।  ভাবলে বিস্মিত হতে হয় যে, এতগুলো লোক এই ছোট্ট বাড়িতে কীভাবে বসবাস করত।  কিন্তু এর সঙ্গে সমাগত অতিথি অভ্যাগতদের নিয়েও তাঁরা বেশ সুখে স্বাচ্ছন্দ্যেই বাস করতে পারতেন বলে মনে হয়।  
 স্বামীজী যখন এই বাড়িতে থাকতেন,তখন তিন বোন (এবং কিছু দিন মিস ম্যাকলাউডও ) ঘুমাতেন সামনের দুটি ঘরের মধ্যে বড় ঘরটিতে -(মিসেস হ্যান্সব্রো  -র ভাষাতে 'হাসপাতালের রোগীদের মতো। ') স্বামীজীকে  ব্যবহারের জন্য একটি ঘর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল- তা পূর্বেই বলা হয়েছে।  বৃদ্ধ মি: মীড (তখন তাঁর বয়স ৮৪ বত্সর ) নিচের তলায় শুতেন, রাল্ফ থাকত সামনের ছোট ঘরটিতে। আর মিস ফেয়ার ব্যাংকস এবং ডরথী ঘুমাতেন গির্জার চূড়ার  ন্যায় ছোট চিলেকোঠাতে।  মিসেস কোহেন  মনে রেখেছিলেন   যে,সেই ছোট চিলেকোঠাতে  উঠতে হত স্বামীজীর ঘর এবং স্নানের ঘরের মধ্যিখানে অবস্থিত সরু একটা  সিঁড়ি  বেয়ে।  এভাবেই স্বামীজী জনবহুল এ বাড়িতে একান্তভাবেই  নিজের মতো করে থাকতে পারতেন।  এই বন্ধুত্বভাবাপূর্ণ খোলামেলা অবসরময়  পরিবেশে স্বামীজী ইচ্ছামতো বসবাস করতে পারতেন -  ভদ্রতা জ্ঞাপক গৃহস্থালির কোনও আনুষ্ঠানিক চালচলন তাঁকে বিব্রত করত না।  মিসেস হ্যান্সব্রো বলেছেন -" যদিও স্বামীজী বাইরে যাবার সময় বা কোন অপরিচিত  ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তাঁর পোশাক -পরিচ্ছদ সম্বন্ধে খুবই  সচেতন ছিলেন, বাড়িতে কিন্তু তিনি যেমন-তেমনভাবেই চলাফেরা করতেন। এক রবিবার সকালবেলা তিনি বলে উঠলেন ,'বাড়িতে আমি পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পর্কে এতটা  সচেতন থাকব কেন ?-আমি তো আর বিয়ে করতে চাইছি না!'  আর একদিন যখন আমার বোনপো  রাল্ফ স্বামীজীর জুতো পালিশ করছিল, তখন স্বামীজী  তাকে বললেন,' জান ,রাল্ফ  ! এই অদ্ভূত মেয়েলি ব্যাপারটা আমার কাছে যাচ্ছেতাই বলে মনে হয়  !' পাশ্চাত্য দেশে বিভিন্ন সময়ে   এবং স্থানে রকমারি সব  'পোশাক' পরে যাবার যে একটা বাধ্যতামূলক ব্যাপার আছে, তাকে স্বামীজী একটা লোক-দেখানো ব্যাপার বলে উড়িয়ে দিতেন।" 

   প্রতিদিন সকাল প্রায় ৭ টা নাগাদ স্বামীজী সাদা-কালো রং -এর স্নান ঘরের হেরিং  মাছের কাঁটার মতো দেখতে সেলাইয়ের ডিজাইন দেওয়া খসখসে পশমি  বস্ত্রের পোশাক ,কোমরে দড়িবাঁধা - পরেই নিচে নেমে আসতেন।  স্নান করার পর এলোমেলো  ভিজে চুলেই থাকতেন-যেমনটি মিসেস  ব্লজেটের  বাড়িতেও থাকতেন।  এ সময় তোলা  তাঁর একটা  ফটোগ্রাফেও তাঁর এলোমেলো লম্বা চুল দেখতে পাওয়া যায়। 
  
তাঁর চুল যে লম্বা থাকত ,তা অসাবধানতাবশত  নয়-বরং অন্যের খুশির আবদার  রাখতেই তিনি এরূপ চুল রাখতেন। মিসেস হ্যান্সব্রো তাঁর স্মৃতিচারণে বলেন," তাঁর চুলগুলি খুবই সুন্দরভাবে ঢেউখেলানো ছিল।  বাস্তবিকই এগুলো এতই  সুন্দর ছিল এবং তাঁর চেহারার সঙ্গে এতই মানান সই ছিল যে , আমরাই তাঁকে তাঁর চুল  ছাঁটতে দিতে চাইতাম না।"  তিনি আরও বলেন,"স্বামীজী তাতে কোনো  আপত্তি করতেন না।  তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আপনভোলা মানুষ।"

  ওপরতলা থেকে নেমে আসা এবং প্রাতরাশ আরম্ভ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে স্বামীজী কিছু সময়ের জন্য বাড়ির  পেছনের নির্জন বাগানে একাকী পায়চারি করতেন  অথবা কখনও কখনও একই রকমের নির্জন রাস্তার উপর দিয়ে বেড়িয়ে  আসতেন।  কখনো কখনো গান গাইতেন বা মন্ত্র পাঠ করতেন - কখনো  একেবারে নীরব এবং আত্মসমাহিত হয়ে থাকতেন।  প্রাতরাশ সাত্টাতেই  আরম্ভ হতো ,কারণ রাল্ফের স্কুল স্কুল আরম্ভ হত সাড়ে আটটাতে এবং সবচেয়ে ছোট বোন্ হেলেন ওই সময় লস এঞ্জেলসে তাঁর বীমা কোম্পানির কাজে  যোগদান করতে যেত।  স্বামীজী  বেশ  হালকা এবং ভালো আমেরিকান খাবারই খেতেন।  তাঁর খাবারের মধ্যে মুখ্যত ছিল ফল, দুটি ডিম (তিনি ডিমের পোচ -ই পছন্দ করতেন),দুই টুকরো টোস্ট এবং চিনি ও ক্রিম  দিয়ে দুকাপ কফি।  একদিন মিসেস হ্যান্সব্রো  তাঁকে তৃতীয় এককাপ কফি খাবার  উপরোধ করতে লাগলেন। পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত স্বামীজী বললেন -"বেশ ,দাও।  মেয়েমানুষের স্বভাবই হচ্ছে পুরুষ কে প্রলুব্ধ করা।" কিন্তু তিনি খাওয়া-দাওয়া,কফি-পান  ও পাইপে তামাক খাওয়ার ব্যাপারেও বেশ সংযত-ই 
 থাকতেন।  
     
    যদিও 'বোনঝি হেলেন ' এবং রাল্ফ বাধ্য হয়েই তাড়াতাড়ি প্রাতরাশ  সেরে চলে যেত, মিসেস হ্যান্সব্রো,মিসেস ওয়াইকফ এবং স্বামীজী কিন্তু ধীরেসুস্থে প্রাতরাশ সারতেন।  তাঁরা  কখনও অত তাড়াহুড়ো করতেন না।  পরবর্তী কালে কোন  কোন কদাচিত দুর্লভ দিনে স্বামীজীর যদি সকালবেলা  ক্লাস না  থাকত, তাহলে তিনি আবার বাগানে গিয়ে পায়চারি করতেন অথবা পড়ার ঘরে বইগুলোয়  চোখ বোলাতেন।  মিসেস হ্যান্সব্রো তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন -" কখনও  কখনো তিনি বাড়ির সামনের মাঠে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলা করতেন।  ডরোথী র অনেকগুলো বন্ধুবান্ধবী ছিল -তারা সবাই এসে হাজির হতো এবং তিনি সবাইয়ের  সাথে হাত ধরে 'রিঙ্গা -রিঙ্গা '-ঘোরার খেলা বা অন্য রকমের খেলার আনন্দ উপভোগ করতেন  -তাঁর ছোট ছোট সঙ্গীরা খেলায় যেমনটি আনন্দ উপভোগ  করত -তিনিও ঠিক তেমনি আনন্দ পেতেন।  কিন্তু আবার তিনি শিশুদের চালচলন  লক্ষও করতেও ভালোবাসতেন  এবং তিনি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার  ব্যাপারেও বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। 

   মিসেস হ্যান্সব্রো  তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন : " তিনি বাচ্চাদের সঙ্গে   কথা বলতে ভালোবাসতেন  এবং  তাদের কাজকর্ম  সম্পর্কর নানা প্রশ্নও করতেন:কেন তারা এ খেলাটা  বা ও খেলাটা করতে ভালবাসে এরকম নানা ধরনের প্রশ্ন।  তিনি শিশুদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সমস্যাদি সম্পর্কেও বিশেষ আগ্রহী ছিলেন এবং সময়- সময় তিনি এ বিষয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করতেন।  তিনি মোটেও শাস্তিদান  পদ্ধতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না।  তিনি বলেছেন যে এ পদ্ধতিতে কোনও  উপকারই পান নি।  তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলতেন-'আমি কখনো এমন ব্যবহার করব না ,যাতে শিশুরা ভয় পায়।' কখনও কখনও স্বামীজী পিছনের বাগানে  একটি চালার নিচে শিশুদের সঙ্গে বসে তাদের ছবির বইগুলি দেখতেন।  "তিনি বিশেষভাবে 'এলিস ইন ওয়ান্ডার ল্যান্ড ' এবং 'এলিস থ্রু দি  লুকিং গ্লাস' -বই দুটি পড়ে বেশ মজা পেতেন।  তিনি বলতেন যে বই দুটিতে মানবমনের ক্রিয়াকলাপের  চিত্রটি যথার্থভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং  ক্যারল-এর একটি বিশেষ  অন্তর্দৃষ্টি আছে এবং সেটি অতি অসাধারণ -যার ফলে তিনি এই বই দুখানি লিখতে পেরেছিলেন। বাস্তবিকই স্বামীজী মনে করতেন যে 'এলিস ইন ওয়ান্ডার ল্যান্ড' হচ্ছে এই শতাব্দীর(উনবিংশ শতাব্দী) মধ্যে লেখা শিশুসাহিত্যের  মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।"   

   রাল্ফ স্বামীজীকে খুব ভালবাসত এবং যে কোন সময় ,যে কোন ভাবেই  স্বামীজীর সেবা নিজেই  চেষ্টা করত। সে স্বামীজীর জুতো  পালিশ  করে দিত- ওপরতলা থেকে স্বামীজীর  স্বামীজীর ধুমপানের জিনিস নামিয়ে এনে দিত এবং স্বামীজীর ইচ্ছেমত  আরও অনেক ছোটখাট কাজকর্ম করে দিত।  সময়-সময় তাঁরা দুজনে  গল্প গুজবও করতেন।  একবার স্বামীজী রাল্ফকে  জিজ্ঞাসা করলেন ,' তুমি কি তোমার নিজের চোখ দেখতে পাও?' উত্তরে রাল্ফ বলল  যে সে আয়নাতে  না হলে তা দেখতে পায় না।  তখন স্বামীজী তাকে বললেন,"ভগবানও  হচ্ছেন ঠিক সেই রকম।  তিনি তোমার চোখের মতোই তোমার অতি কাছে আছে।  তিনি তোমার অতি আপনজন।  তাহলেও তুমি তাঁকে  দেখতে পাচ্ছ না। " 

   স্বামীজী প্রায় দিনই ধীরে সুস্থে বাগানে বেড়াতে পারতেন বা ডরোথি ও তার বন্ধুবান্ধবদের  সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারতেন।  তবে প্রায় দিনই তিনি বেলা দশটার সময় নিকটবর্তী পাসাডেনা  শহরে ক্লাস নিতেন। যেদিন ক্লাস থাকত ,সেদিন তিনি নটা সাড়ে নটা নাগাদ মিসেস হ্যান্স ব্রো কে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে  পরতেন।  তিনি তাঁর ঢিলেঢালা  কালো কোটটি ও কালো টুপিটি পরতেন  ,আর সুটকেসে করে নিয়ে যেতেন তাঁর গেরুয়া পোশাক ও পাগড়ি -ক্লাসের আগে তা পরে নিতেন।  যে সেক্সপিয়ার ক্লাবে স্বামীজী অধিকাংশ ক্লাসগুলি নিয়েছিলেন  ,সেখান পৌঁছানো বেশ সহজ ছিল।  বাড়ি থেকে ক-পা বাড়ালেই তিনি এবং হ্যান্সব্রো  বিদ্যুত চালিত ট্রেনে চড়ে পাসাডেনা পৌঁছে যেতেন এবং সেখান থেকে অল্প  একটু দূরত্বে ফেয়ার ওক এভিনিউতে অবস্থিত  সোজা ক্লাবঘরে চলে যেতেন।   

      অন্যান্য সময় কিন্তু স্বামীজী শুধু ভ্রমণের আনন্দের জন্যই ভ্রমণ করতেন।  তিনি বেশ সুস্থ বোধ করছিলেন- না হলেও আগের চেয়ে অনেকটা ভালই।  জানুয়ারী  মাসের ১৭ তারিখে তিনি মিসেস বুলকে লিখেছেন-" স্বাস্থ্যের দিক থেকে নিশ্চিতই  আমি আগের চেয়ে অনেকটা ভালো।  মিসেস মেল্টন  মনে করে আমি এখন স্বাধীন ভাবে  ইচ্ছামত যত্রতত্র যেতে পারি- এভাবে আমার চলতে হবে, তাহলেই আমি অল্প কয়েক মাসে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠব। "
তবে একথা সত্য যে, স্বামীজী যতদিন মীডদের পরিবারে ছিলেন,ততদিন তিনি বাস্তবিকই  তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য রোগে অসুস্থ হয়ে পড়েন নি।  মিসেস হ্যান্সব্রো-র স্মৃতি অনুসারে -"তাঁকে সবসময়ই বেশ হাসিখুশি দেখাত , বিশেষত  তিনি যখন কোনো বিশেষ একটা কাজে মগ্ন হয়ে থাকতেন।  তিনি যতদিন আমাদের বাড়িতে ছিলেন, তখন  কখনো তিনি তাঁর অসুস্থতার কথা আমাদের কাছে বলেননি।  সে সময় তিনি কোনও বেলা তাঁর খাবার বন্ধ করেন নি, অথবা কখনও  কোন প্রকারে এমন   ভাব দেখান নি যে তিনি অস্বুস্থ।"

 স্বামীজী যে শুধু প্রতি বেলায় তাঁর খাবার খেয়েছিলেন নয়,তিনি প্রায় সব রকম  খাবারই খেয়েছেন এবং এতে তাঁর শরীর খারাপ করেছিল বলে মনে হয় নি।  আগেই দেখা গেছে,তিনি প্রাতরাশে বেশ  ভালই খেতেন। দুপুরের আহারে সাধারণত  তিনি ভেড়ার মাংস খেতেন;তার সঙ্গে থাকত নানা   রকমের পছন্দমত শাক সবজি  -বিশেষত  কড়াই শুঁটি।  মিসেস হ্যান্সব্রো -র স্মৃতি অনুযায়ী -"আহারের শেষভাগে  মিষ্টি ইত্যাদি খাবারের স্থলে আমরা ফলই খেতাম। আঙুর  তাঁর বিশেষ প্রিয় ছিল। " কিন্তু কোন কোন প্রকারের ফল তিনি পছন্দ করতেন না।  একবার একটি ঘটনায় তাঁর ইঙ্গিতে বুঝে গেলাম তিনি পেয়ারা পছন্দ করেন না।  তারপর থেকে খাবার টেবিলে আমরা পেয়ারা রাখতাম না।  

      প্রায়ই স্বামীজী তাঁর সকালবেলার   ক্লাসের কোন না কোন ব্যক্তিকে মীডদের বাড়িতে  মধ্যাহ্নভোজের জন্যে নিমন্ত্রণ করে   নিয়ে আসতেন। উপরন্তু মিস ম্যাকলাউড  এবং মিসেস লেগেটও  লস এঞ্জেলস  থেকে সকালবেলা  স্বামীজীর ক্লাসে যোগ দিতে এসে প্রায়ই  মীড দের বাড়িতে দুপুরের   আহার করে যেতেন।  এইসব ভোজসভায় খুবই  অন্তর্দৃষ্টি উদ্দীপক এবং প্রাণপ্রদ  আলাপ আলোচনা হত। কোনো  কোনো দিন -সম্ভবত প্রায় দিনই আলোচনার প্রসঙ্গ চলে আসতো ভারতবর্ষ  সম্পর্কে।  ভারতের কথা তাঁর মন থেকে কখনও মুছে যেত না - তাঁর দেশবাসীর নানা সমস্যার কথা  ভেবে ভেবে তিনি কখনও কখনও হতাশায় নীরব ও স্তব্ধ  হয়ে যেতেন। কখনো কখনো তাঁর অন্তর থেকে প্রতিবাদের অসহনীয়  সুর উত্সারিত হয়ে উঠত।  মিসেস লেগেট স্বামীজীর সব কথাতেই  শ্রদ্ধার সঙ্গে সায়  দিতেন।  তিনি হিন্দুদের শান্তশিষ্ট প্রতিকারহীন ভাবকে  প্রশংসা করেই স্বামীজীকে কিছু বলেন। উত্তরে স্বামীজী বলেন ,'হিন্দুদের এরূপ মনোভাবকে  তুমি কিরূপে ভালো বলে প্রশংসা করতে চাও? তুমি কি মনে কর যে , যদি হিন্দুদের একটুও ক্ষাত্রবীর্য থাকত ,তাহলে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ইংরেজ  ভারতবর্ষকে শাসন করতে পারত ? আমি ভারতের সর্বত্র আমিষ আহারের উপকারিতার  কথা প্রচার করে থাকি, তাতে যদি আমরা ক্ষত্রিযচিত  পৌরুষ জাগিয়ে তুলতে পারি। '  

   মধ্যাহ্নভোজের মধ্যে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হতো নিকটবর্তী  পাহাড়ের উন্মুক্ত চূড়ার  ওপর অনুষ্ঠিত বনভোজন।  হ্যান্সব্রো   বলেন: "আমরা যারা নিয়মমত স্বামীজীর ক্লাসে যোগদান করতাম  ,তাদের কয়েকজন মিলে  একটা দল  গড়তাম। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কথাবার্তা হত আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে। পিকনিক করতে আসা  দলের সঙ্গে স্বামীজীর একটি ছবি বিবেকানন্দ হাউসের দেওয়ালে টাঙ্গানো  আছে।  ওই ছবিটি তোলা  হয় ওই পাহাড়ের চূড়ার উপরে।"  এই ফটোর মধ্যে স্বামীজী আসন করে বসে আছেন পিকনিকের চাদরের ওপর ; তাঁর বাঁদিকে বসে আছেন হ্যান্সব্রো,পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন মিসেস ওয়াইকফ ;আর ডান দিকে আছেন মিসেস ব্রুস নাম্নী জনৈকা মহিলা।  দুপাশে দেখা যাচ্ছে দুই বা তিন জন মহিলা অতিথিকে।  তাঁরা সবাই পরে আছেন সে   যুগের লম্বা ঝুলানো  স্কার্ট ,টাইট অন্তর্বাস ,লম্বা হাতার জামা এবং খুব ভারী মাথার টুপি।  এই ফটোটি তলা হয়েছিল সকলের স্বাভাবিক যেমন তেমন অবস্থায়।  দুজন মহিলা পরস্পর কথাবার্তা বলছেন; মনে হচ্ছে স্বামীজী যেন খুব কৌতুকভরে চীনে তৈরি  মিষ্টি রুটি কিনলে কি রকম সম্পত্তি লাভ করা যায়, সে বিষয়ে এক টুকরো কাগজ থেকে কি যেন পড়ছেন  ,আর মিসেস ব্রুস স্বামীজীর কাঁধের ওপর দিয়ে তা পড়ার  চেষ্টা করছেন।  কারও গায়ে কোনো কোট ,শাল  অথবা  চাদর না থাকাতে অনুমান করা যায় যে সেদিন কার আবহাওযা ছিল খুবই আরামদায়ক।  সে বছর শীতকালের প্রায় প্রতিটি দিনই ছিল এরূপ আরামদায়ক।   

জানুয়ারী মাসের সেই সব শান্ত নীরব উষ্ণ দিনগুলোতে বনভোজনে অংশগ্রহণকারী সকলে যেখানে ওপর   থেকে নিচের  দিকে তুষারাচ্ছন্ন পর্বতের ঢালে বিস্তীর্ণ  শস্যসমৃদ্ধ  উপত্যকাগুলি দেখতে পাওয়া যেত সেরকম স্থানে বসে  কথাগুলো  শুনতো আর তা শুনতে শুনতে তারা যেন তাদের অস্তিত্বের  উচ্চতর স্থানে উন্নীত হয়ে তাদের মাঝে প্রজ্জ্বলিত  দিব্যবহ্নির আমেজে একেবারে অভিভূত হয়ে পড়ত।  মিসেস হ্যান্সব্রো   বলেন-"যখন স্বামীজী কোথাও কিছুক্ষণের জন্য  কথাবার্তা বলতেন ,তখন সেই সমগ্র পরিবেশটি  যেন এক আধ্যাত্মিকভাবে  ভরপুর  হয়ে যেত। " মিসেস হ্যান্সব্রো একটি বিশেষ ঘটনার কথা বলেছেন ,যেখানে স্বামীজী একটি বিষয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একেবারে তন্ময়  হয়ে গিয়েছিলেন।  তিনি বলেছেন - "স্বামীজী অবিরতভাবে একটানা না থেমে  সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টে পর্যন্ত  ছ ঘন্টা বিষয়টি আলোচনা করলেন।  যখন তাঁর আলোচনা শেষ হলো তখন স্থানটি এক আধ্যাত্মিক ভাবে একেবারে ভরপুর হয়ে গিয়েছিল। "

   তাহলে মীড দের বাড়ির পরিবেশটি না জানি কিরূপ হয়ে উঠেছিল।   বোনদের অনুভব সম্পর্কে পরে এক    বোন বলেছিলেন-"স্বয়ং যিশুখ্রিস্টই  যেন তাঁদের মধ্যে বিরাজিত ছিলেন।" তিনি তাঁর সম্পূর্ণ অবসর সময়ে বা চরম কর্মব্যস্ততার মধ্যে যা কিছুই  করুন না কেন ,তাঁর মন সর্বদা সচেতনভাবেই এক উচ্চস্তরের ঈশ্বরীয় ভাবে নিমজ্জিত হয়ে থাকত। কারণ এটাই ছিল তাঁর স্বাভাবিক  অবস্থা।   কিন্তু  দেখলে কখনো মনে হত না যে ,তিনি একজন অতিমানব অথবা নাগালের বাইরের  কোনো এক সত্তা ,পরন্তু তাঁকে মনে হতো অতি আপনজন।  মিসেস হ্যান্সব্রো   তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন - "আমাদের সকলের ক্ষেত্রেই স্বামীজীর ধৈর্য ছিল অপরিসীম। তিনি যে আমাদের চেয়ে বড় -এ ভাবটি আমাদের মন থেকে দূর করে দিয়েছিলেন। যদিও তাঁর মধ্যে কেউ কেউ উদাসীনতার ভাব   দেখতে পেয়েছেন, আমি কিন্তু কখনও তা দেখিনি।  আমি মনে করতাম যে সর্বদাই তাঁর সঙ্গে আমার একটা ঘনিষ্ঠ  সম্বন্ধ আছে।  যেন তিনি আমার এমন এক আপনজন  ,যাঁকে দীর্ঘকাল দেখিনি এবং যিনি দীর্ঘকাল যাবত  আমার কাছে আসছেন।  আমার মনে হত আমার কোথাও যেন একটা বেদনার ভার আছে-সে ভার আমার পিঠে নয়,আমার হৃদয়ে।  স্বামীজীর সঙ্গে  সাক্ষাত হবার পর আমি অনুভব করলাম যে , আমার হৃদয়ের সে বেদনার ভার কে যেন তুলে নিচ্ছে  ,ক্রমে ক্রমে আমার সে বেদনার অনুভবটি দূর হয়ে গেল।  

     এর চেয়েও স্থুল এবং বহুজনবিদিত একটি কাহিনী আছে -যাতে মিসেস ওয়াইকফ  তাঁর এক মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি লাভ করেছিলেন  -স্বামীজীর ব্যবহৃত তামাক খাবার পাইপটি স্পর্শ করে।  মিসেস হ্যান্সব্রো কাহিনীটিকে এভাবে বিবৃত করেছেন  :"দক্ষিণ পাসাডেনা ছেড়ে যাবার কিছু দিন পূর্বে  স্বামীজী আমাকে বললেন -'আমি যেখানেই যাই না কেন ,সেখান থেকে চলে যাবার সময় আমি কিছু একটা জিনিস  ফেলে রেখে যাই।  এবার সানফ্রানসিসকো  যাবার সময় আমি আমার এ পাইপটা এখানে রেখে যাব। ' তিনি খাবার ঘরের উনুনের  পাশের তাকের উপরে পাইপটি রেখে গেলেন।  আমরাও সেখানে এই পাইপটাকে অলংকারের মতো অনেকদিন ধরে সাজিয়ে রেখেছিলাম।  তারপর একদিন মিসেস ওয়াইকফ এসে ওটাকে হাতে তুলে নিলেন। তিনি বহুদিন যাবত কোন স্নায়বিক অসুখে ভুগছিলেন এবং তাঁর জীবনে আরও  নানা ব্যক্তিগত সমস্যাদি ছিল।  কিছু দিন যাবত তাঁর অসুখ প্রায় অসহনীয়  হয়ে উঠেছিল এবং সঙ্গে আরও সব নানা গোলমাল এসে জুটল।  সব মিলে  তিনি একেবারে মনমরা হয়ে পড়লেন।  তিনি উনুনের পাশের তাকের কাছে  গিয়ে স্বামীজীর সেই পাইপটি হাতে তুলে নিলেন।  সেই পাইপটা  হাতে তুলে নিতে না নিতেই তিনি একটি দিব্যবাণী শুনতে পেলেন -'ম্যাডাম  ,এ কাজটা কি খুব কঠিন ?' যে কোনো কারণেই হোক তিনি সেই পাইপটাকে তাঁর কপালের উপর ঘসলেন।   সঙ্গে সঙ্গেই  তাঁর যন্ত্রণা কমে গেল।  তিনি যেন একটা স্বস্তির ভাব  অনুভব  করতে থাকলেন।  তারপর আমাদের মনে হলো  এই পাইপটা  তাঁর কাছে থাকাই ভালো এবং বহুদিন পর্যন্ত সেটা তাঁর কাছেই ছিল। " (বর্তমানে এই পাইপটি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বেদান্ত সোসাইটির অধিকারে আছে।  )  

   তবে স্বামীজীর সবচেয়ে তাতপর্যপূর্ণ  দৈব  শক্তির খেলা হলো ,তিনি যেখানেই থাকতেন,সেখানেই তাঁর চারপাশে  একটি অনির্বাণ  জ্যোতির  বেষ্টনী রচনা করত। যাঁরা  তাঁর খুবই ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে  ছিলেন, তাঁদের স্মৃতিতে স্বামীজীর সামান্য,ছোট -আপাত তুচ্ছ  ব্যাপার বা তাঁর কথাবার্তাও স্পষ্ট  বিরাজিত আছে।  তাঁরা এতই  শ্রদ্ধার সঙ্গে এগুলিকে স্মরণে রেখেছেন ,কারণ তাঁরা স্পষ্টই জানতেন যে এসবই ছিল স্বামীজীর অতীন্দ্রীয় অনুভূতিপ্রসন্ন বিষয়। তাঁর   প্রতিটি   চালচলন ছিল দিব্য করুণা  ও মহিমার প্রকাশ।  স্বামীজীর এই চিরন্তন দৈবশক্তির মহিমা, উপরন্তু  তাঁর অকস্মাত জ্যোতির্ময় এবং উজ্জ্বল শক্তির বিস্ফুরণের জন্যই মীড  ভগিনীগণ প্রতিটি মুহুর্তেই মনে করতেন যে  যিশুখ্রিস্ট  স্বয়ং তাঁদের মধ্যে বিরাজিত আছেন। সে সময়কার পূর্বাপর ঘটনাবলীর প্রতিটিই যে খুব উল্লেখযোগ্য  ছিল,তা নয়।  বরং একটি প্রদীপ যেমন প্রজ্জ্বলিত অবস্থায় থাকে -তেমনি প্রতিটি  দিন,প্রতিটি ঘন্টা স্বমহিমায় মূর্ত থাকত।  

       দৈনন্দিন কার্যসূচি ছিল খুবই সহজ সরল।  দুপুরে আহারের পর স্বামীজী সাধারণত  শোবার ঘরে সোফায় হেলান দিয়ে শুয়ে বই পড়তেন বা কথাবার্তা বলতেন  আর তখন মিসেস ওয়াইকফ ব্যস্ততার সঙ্গে তাঁর গৃহস্থালির যতসব কাজকর্ম  সেরে  নিতেন।  একদিন স্বামীজী তাঁকে বললেন ,"ম্যাডাম ,আপনি এত পরিশ্রম  করে সব কাজকর্ম করেন ,তাতে আমিই যেন ক্লান্তিবোধ করি।  আচ্ছা ক্ষেত্রবিশেষে  মার্থারও প্রয়োজন হয় ,আর আপনি হচ্ছেন একজন মার্থারই মতো। "  

   আবার কখনও কখনো তিনি তাঁকে তাঁর কাজকর্ম রেখে তাঁর সঙ্গে বাগানে বেড়াতে যেতে বলতেন।  বাগানে বেড়াতে বেড়াতে তিনি বাংলা গান গাইতেন অথবা সংস্কৃত  মন্ত্র আবৃত্তি করতেন।  মিসেস হ্যান্সব্রো আমাদের বলেছেন: " তিনি আমাদের কাছে ঐসব ব্যাখ্যা করতেন তাঁর ব্যক্তিগত ভাব ভঙ্গিতে -মঞ্চে ভাষণ দেবার সময় যেভাবে ব্যাখ্যা করতেন তার চেয়েও অনেক   নিবিড়  আন্তরিকতায়।"   আবার কখনো কখনো হয়ত তিনি খ্রিস্টীয় প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতেন: "পৌত্তলিকেরা অন্ধভাবে   গাছ পাথরকে  প্রণাম  করে।"  মিসেস হ্যান্সব্রো স্বামীজীকে এসব কথা শিখিয়েছিলেন এবং স্বামীজীও এসব শুনে বেশ কৌতুক অনুভব করেছিলেন।  তিনি হেসে জবাব দিতেন -"আমি হচ্ছি সে 'হিদেন' -মূর্তিপূজক।"  

 খুব সম্ভব বিকালবেলাতে  স্বামীজী কিছু লেখার কাজ করতেন। মিসেস বুলকে ও নিবেদিতাকে অনেক গল্প লিখে পাঠাতেন। তাঁর ক্যালিফর্নিয়া থাকাকালে নিবেদিতাকে  একটি সুন্দর কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন। কবিতাটির নাম 'কে জানে মায়ের খেলা।' কবিতাটির প্রথম আরম্ভ হচ্ছে -
 "কে জানে -হয়তো তুমি ক্রান্তদর্শী ঋষি !
সাধ্য কার স্পর্শে সে অতল গভীর গহন ,
যেখানে লুকানো রয়  হাতে অমোঘ অশনি। "

আর এই কবিতাটির সমাপ্তি হচ্ছে:

" হয়তো শিশুর চোখে দিব্যদৃষ্টি জাগে,
 স্বপ্নেও ভাবেনি যাহা  পিতার হৃদয় ,
  হয়তো সহস্র শক্তি কন্যার অন্তরে 
রেখেছেন বিশ্বমাতা সযত্ন সঞ্চয়। "
এই কবিতাটি  'জন্মদিন' উপলক্ষে লেখা।  উত্তরে নিবেদিতা ১৩ই জানুয়ারী লিখলেন," জন্মদিন উপলক্ষ্যে লেখা আপনার আশীর্বাদী কবিতাটি গতকাল রাতে পেয়েছি।  এর উত্তরে আমি আর কি লিখব,বলুন ? কি-ই বা আমি লিখতে পারি? যা লিখব,তাই অতি সাধারণ শোনাবে।  শুধু বলতে পারি, আপনার সুন্দর ইচ্ছাটি যদি বাস্তবে ঘটেও ,তা আমার পক্ষে হৃদয়বিদারক হবে।  আমি শান্তি পাব না,যদি নিশ্চিতভাবে আমি একথা না বুঝি আমার গুরু (যে আনন্দের অধিকারী হয়েছেন,তা ) মহত্তর।   

   এটা খুবই সম্ভব যে,বিকালবেলাগুলিতে স্বামীজী কখনো কখনো ব্যক্তিগতভাবে  কাউকে দর্শন দিতেন অথবা যাঁরা  মীড ভগিনীদের বাড়িতে আসতেন, তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা  বলতেন। তাহলেও তিনি সবসময়ে কথাবার্তা বলার মেজাজে  থাকতেন না।  
বিকালবেলার শেষ দিকে স্বামীজী নৈশ ভোজ তৈরী করার ব্যাপারে কখনো কখনো  মিসেস ওয়াই কফকে সাহায্য করতেন এবং প্রায়শই তিনি নিজেই সব কটি  পদ রান্না করতেন।  মিসেস হ্যান্সব্রো বলেছেন-"যখন লিঙ্কন পার্কে আমাদের বাড়িতে থাকতেন, তখন তিনি নিজেই সকলের জন্যে পুরো রান্নাটাই  সেরে ফেলতেন।  তিনি প্রায়ই তরকারি ও চাপাটি তৈরি করতেন, যা রাল্ফ ও  ডরোথির খুব প্রিয় হয়ে   উঠেছিল।  তিনি যেসব মশলাপাতি দিয়ে রান্না করতেন ,তার অধিকাংশকেই বাটতে হতো (গুড়ো  করতে হতো ) . যেহেতু তিনি  টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করা পছন্দ করতেন না ,সেজন্য তিনি একটি মাখন রাখার  বাটি  তাঁর সামনে রেখে আসনপিড়ি করে রান্নাঘরের মেজেতে বসে পড়তেন।" স্বামীজী মশলাগুলো গুড়ো করে নেবার পর ঐগুলো দিয়ে ভাজার জন্য- তরকারি  সাঁতলাবার জন্য উনুনের কাছে যেতেন।  মশলা 
সাঁতলানোর সময় মশলার যে চোখ -জ্বালা করা ধোঁয়া বের হতো তাতে বোনেদের  নাস্তানুবুদ হতে হতো -তার এক সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন ব্রহ্মচারিণী  ঊষা  তাঁর লেখা এক প্রবন্ধে যা 'বেদান্ত এন্ড দি ওয়েস্ট 'পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে।  স্বামীজী সবাইকে সাবধান করার জন্য আগে থেকেই  উঁচু গলায় ঘোষণা  করতেন -'ঐ  ঠাকুরদাদা আসছেন, মহিলাদের বেরিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। ' 

  হ্যান্সব্রোর উক্তি   অনুসারে স্বামীজী খুব একটা হাসতেন না বা ঠাট্টা ইয়ার্কি করতেন না।  স্বামীজী  সবচেয়ে হাসিখুশির মেজাজে থাকতেন যখন তিনি রান্নাঘরে স্বাধীনভাবে  ছোটাছুটি করে সমগ্র পরিবারের জন্য হরেক রকমের ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর  পদের রান্না করার অনুমতি পেতেন।  কিন্তু স্বামীজীর হাসিখুশির হালকা মেজাজের  সময়ও তাঁর সান্নিধ্যে থাকতে পারলে বহু কিছু শিক্ষা করা যেতো।  তিনি কখনো মৌখিক নীতি উপদেশ দিতেন না। তিনি শুধুমাত্র চোখ খুলে দিতেন আর তাঁর এই সময়ে অসময়ে দেওয়া শিক্ষাগুলি  কেউ  ভুলতে পারত না।  

      মীড দের পরিবারে নৈশভোজ হত সাধারণত সাড়ে ছটায় এবং যেসব রাত্রে আটটার  সময় স্বামীজীর ভাষণ দানের কর্মসূচী থাকত ,সেসব দিনে হয়তো আরও আগেই রাত্রির আহার হয়ে যেত।  মিসেস হ্যান্সব্রো-র স্মৃতি অনুসারে ভোজ্যপদগুলি  বেশ পুষ্টিকরই ছিল :" আমরা সাধারণত সুপ এবং হয় মাছ না হয় মাংস  ,শাকসব্জি এবং শেষে মিষ্টি ইত্যাদি -যেমন মাংস ও ফলের পিঠে যাকে পাই বলা হয়  তাই খেতাম।  স্বামীজী অন্য যেসব মিষ্টি ভালবাসতেন ,তাও খেতাম।  সাধারণত তিনি রাত্রে কফি খেতেন না।" তবে প্রায়ই অবশ্য স্বামীজীর তৈরি  তরকারি ,চাপাটি এবং অন্যান্য খাবারও  থাকত।  রাত্রির আহারের পর টেবিলটি  পরিস্কার করা হতো ; চুল্লির খোলা ঝাঁঝরির সামনে   আগুন জ্বালা হতো এবং পরিবারের সকলে ও অতিথিবর্গ এই গরম ঘরে অনেকক্ষণ  পর্যন্ত থেকে যেতেন।  কেউ বসতেন টেবিলের পাশে,কেউবা ইজিচেয়ারে।  স্বামীজীর বসার জন্য এমন একটা বড় ইজিচেয়ার বানানো হয়েছিল যার উপর তিনি আসন করেও বসতে পারতেন।  তিনি সাধারণত পরতেন, যাকে বলা যায় ,একটা 'ডিনার  জ্যাকেট ' বা 'ধূমপানের জ্যাকেট।'  ঘরভর্তি  লোক,আগুনের উত্তাপ এবং গ্যাসের আলো মিলে  কখনো কখনো ঘরটি  স্বামীজীর কাছে বেশি গরম বলে মনে হতো।  একদিন যখন সকলের অলক্ষ্যে  আগুনের শিখাগুলি নিভে গিয়েছিল ,তখন স্বামীজী হঠাত ঈশ্বরের নামে জয়ধ্বনি  দিয়ে উঠলেন -"জয়, প্রভুর জয়-আগুন নিভে গেছে। "   

    স্বামীজী রাত্রির আহারের পর তাঁর খুব অন্তরঙ্গ ব্যক্তিদের সঙ্গে যেসব আলোচনা করতেন  ,তা যদি তাঁদের কেউ লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারতেন,তাহলে তা দিয়ে একটা বই হয়ে যেত  -কিন্তু কেউই তা  করেন নি।  তবে যাই হোক ,চল্লিশ বত্সর পরে মিসেস হ্যান্সব্রো তাঁর স্মৃতিচারণে বলেন, "স্বামীজী   বহুবিধ বিষযে আলাপ আলোচনা করতেন ;দর্শন,বিজ্ঞান ,যুক্তরাষ্ট্রের  উন্নতি -ইত্যাদি নানা বিষয়ে।  তিনি আমাদের জাতীয় জীবনের সকল বিষয়েই খুব উত্সাহী  ছিলেন। তিনি আমাদের বৈষয়িক জীবনে এতটা মনোযোগ দেওয়া পছন্দ করতেন না।  ঘরোয়া কথাবার্তার সময় তিনি একদিন আমাদের বলেছিলেন যে, যদি আমরা সব কিছুকে আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টিতে গ্রহণ  না করি ,তাহলে আমাদের সভ্যতা আগামী পঞ্চাশ বত্সরের মধ্যেই   ভেঙে পড়বে। তিনি বলেছিলেন যে আমরা বৈষয়িক মূল্যবোধের ওপরই দেবত্ব আরোপ করছি, তাই আমরা এই ভোগবাদের ভিত্তির ওপর কিছুই চিরস্থায়ীরূপে  গড়ে তুলতে পারব না। "

         কখনো কখনো এসব রাত্রে স্বামীজী উচ্চকন্ঠে শাস্ত্রাদি পাঠ করতেন।  
হ্যান্সব্রো র স্মৃতি অনুসারে তিনি ছিলেন একজন সুললিত পাঠক ও আবৃত্তিকার -তাঁর ইংরেজি উচ্চারণ ছিল চমত্কার।  তিনি নানা গ্রন্থ থেকে পাঠ করতেন।  একবার তিনি যখন অদ্বৈতবাদ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন ,তখন তিনি তাঁর 'সন্ন্যাসীর গীতি' কবিতাটি আনতে বলেন এবং উহা পাঠ করে শোনান।  অন্য একদিন বেশি রাত্রে তিনি 'গুরুর প্রয়োজনীয়তা' লেখাটা (তাঁর ভক্তিযোগ গ্রন্থের অন্তর্গত) আনতে বলেন। তখন তিনি আমাদের বোনঝি হেলেনের সঙ্গে কথাবার্তা  বলার সময় তাকে শুনিয়েই লেখাটা পড়লেন।  তিনি কিছুক্ষণ পড়েই  চললেন;তখন যে কোনো কারণেই হোক ,হেলেন তার আসন ছেড়ে উঠে একটি শোয়ার  ঘরের মোমবাতি  জ্বেলে তা স্বামীজীর হাতে তুলে    দিল।  স্বামীজী তাকে জিজ্ঞাসা  করলেন-"এর দ্বারা কি তুমি বুঝাতে চাইছ যে,এখন আমার ঘুমোতে যাওয়া প্রয়োজন ?" উত্তরে হেলেন বলল -"হ্যা ,তাই। এখন রাত্রি ১১টা  বেজে গেছে। " তারপর সব কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেল।  'বোনঝি
 হেলেন ' -এর এরকম অগ্রপশ্চাত না ভেবে ঝপ  করে করে  ফেলা এই কাজটি তিন  বোনই দীর্ঘকাল মনে রেখেছিলেন। মিসেস হ্যান্সব্রো তাঁর স্মৃতিকথাতে লিখেছেন,  " বহুদিন পরও আমরা এই ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা করছিলাম  এবং আমাদের তিন বোনই তখন বুজতে পেরেছিলাম যে, পরোক্ষভাবে স্বামীজী হেলেনকে তাঁর কাছে দীক্ষাপ্রার্থী  হতে আহ্বান জানাচ্ছিলেন।  হেলেন বলল যে সে জানে না ,কেন সে দীক্ষা নেয়নি।  তখন তার মনে দীক্ষা  গ্রহণের কোনো প্রেরণা জাগে নি। "  তার এই কথাটি প্রকৃত অবস্থাকে লঘু করে দেখানোর একটা প্রচেষ্টা বলেই মনে হয়।  

      বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, মীড ভগিনীদের কেউই স্বামীজীর কাছ থেকে  আনুষ্ঠানিক  কোন দীক্ষা গ্রহণ করেনি অথবা তারা নিজেদের কখনও স্বামীজীর অদীক্ষিত  শিষ্য বলেও মনে করেন নি। পরবর্তীকালে মিসেস
 ওয়াইকফ এবং হেলেন স্বামী তুরীয়ানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।  তিনি ওয়াই কফকে দীক্ষান্ত নাম দেন 'ললিতা।' মিসেস হ্যান্স ব্রো সম্পর্কে আর  একটি  ঘটনা -স্বামীজী তাঁকে একবার প্রশ্ন করে বসলেন -"আপনি কেন আমাদের সংঘে  যোগ দিতে পারছেন না ?" তাঁর উত্তর ছিল এই যে, তাঁর ছিল একটা নিজস্ব ক্ষুদ্র  জগত ,যাঁর জন্য তাঁকে সর্বদা ভাবতে হত।  পরবর্তীকালে মিসেস হ্যান্সব্রো বেদান্ত সমিতির সভ্যা হন এবং স্বামী তাঁকে নাম দিয়েছিলেন 'শান্তি'-কিন্তু শান্তি তাঁর কাছ থেকে কোনো দীক্ষা  গ্রহণ করেন নি।  

   তাহলেও ঠিক বলতে গেলে মীড ভগিনীগণ স্বামীজীর শিষ্যত্ব গ্রহণ না করলেও -তাঁরা সবাই তাঁকে ভালবাসতেন এবং খুব ভক্তিভরে তাঁর সেবা করেছেন।  তাঁরা সবাই ছিলেন তাঁর একান্ত আপনজন।  স্বামীজীও  মীড ভগিনীদের বিশেষ  স্নেহ করতেন।  তিনি একসময় তাঁদের বলেছিলেন ," আগে থেকেই তোমাদের তিন বোনকে  জানতাম। " বিভিন্ন পত্রে নানা সময়ে তাঁদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা  করেছেন স্বামীজী।  বেটি লেগেটকে তিনি লিখেছিলেন ,
"ঈশ্বর তাঁদের মঙ্গল করুন ; ভগিনী তিনটি দেবদূতী নয় কি ? এখানে সেখানে এই ধরনের মানুষের সঙ্গে সাক্ষাত্কার সকল নিরর্থকতাকে সার্থক করে তোলে।"  স্বামী তুরীয়ানন্দকে লিখিয়াছিলেন," অকৃত্রিম, পবিত্র ও সম্পূর্ণ নি:স্বার্থ বন্ধু এরা। " 
মীড দের গৃহত্যাগকালে স্বামীজী বলিয়াছিলেন,"তোমরা তিন বোন চিরতরে আমার মনের অংশবিশেষ  হয়ে গেছ। "

    ১৯০০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে যখন স্বামীজী মীড দের বাড়ি ছেড়ে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার  সানফ্রান্সিসকো  শহরে যান ,তিনি তাঁর পাইপটি ফায়ারপ্লেসের  ম্যান্টেলের উপর রেখে উঠে বলে ওঠেন ," এই বাড়িটি আর আগের মত থাকবে না। " তাঁর এই সরল উক্তি পরে সত্যি হয়েছিল।  বর্তমানে এই বাড়িটি এক পুণ্যসৌধে  পরিণত  হয়েছে এবং স্বামীজীর ভক্তদের কাছে এক তীর্থক্ষেত্রের  রূপ নিয়েছে। 

     স্বামীজীর পাসাডেনা ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে মীড দের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়
নি।  স্বামীজীর বিশেষ অনুরোধে শান্তি সানফ্রান্সিসকোতে   স্বামীজীর সঙ্গে যান।   ওখানে তিনি স্বামীজীর সর্বকার্যে নিযুক্ত থাকতেন এবং তাঁর সেক্রেটারির কাজ করতেন। এই প্রসঙ্গে স্বামীজী এক পত্রে লিখেছিলেন,"মিসেস হ্যান্সব্রো এখানে আছে, আর আমাকে সাহায্য করতে সে শুধু কাজই করে চলেছে। " এখানকার ক্যাম্পে স্বামীজী একবার অসুস্থ হয়ে পড়লে  শান্তি নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য  ছেড়ে তাঁর সেবা করেছেন।  স্বামীজী তাই মিস ম্যাকলাউড কে লিখেছিলেন,"ভগিনীটি  এত দরদ দিয়ে আমার সেবা করেছে যে তুমি অনুমান করতে পারবে না। " 
এখানেই স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি   গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর পাসাডেনাতে অবস্থিত মীডদের বাড়িতে থাকালীন জীবনযাত্রার একটি বিবরণ লিপিবদ্ধ  করা সমাপ্ত করলাম ।  

Saturday, August 30, 2014

স্বামী বিবেকানন্দের পুণ্যস্মৃতি বিজড়িত আমেরিকার দক্ষিণ পাসাডেনার বিবেকানন্দ হাউস


ভূমিকা 

উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলবর্তী  ক্যালিফর্নিয়া রাজ্যের লস এঞ্জেলস কাউন্টির অন্তর্গত একটি প্রাচীন ঐতিয্যপূর্ণ শহরের নাম  পাসাডেনা।  এই পাসাডেনা শহরের দক্ষিণ প্রান্তের শান্ত মুক্ত  পরিবেশে তৎকালীন  ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের আদলে গড়া একটি বাড়ি ১৯০০ সালে স্বামী বিবেকানন্দের পাদস্পর্শে ধন্য হয়েছিল। ৩০৯ নম্বর মন্টেরী রোডে অবস্থিত এই বাড়িটি এখন বিবেকানন্দ হাউস নামে সুপরিচিত।

আমার কনিষ্ঠ পুত্র কার্যপলোক্ষে এই পাসাডেনা শহরের বাসিন্দা ছিল সেই সময়ে। স্বামী বিবেকানন্দের আমেরিকার পাসাডেনাতে গমন এবং সেখানে একটি বাড়িতে অবস্থানের কথা পূর্বেই বই পড়ে জানতে পেরে ওই পুণ্যস্থানটি  দেখার বাসনা ছিল মনে মনে।  ২০০১ সালের জুলাই মাসে ছেলের  কাছে যাবার যখন সুযোগ এলো তখনও এই বাসনা মনের মধ্যে রেখেই ওখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম। 


বিবেকানন্দ হাউসের সামনে থেকে তোলা  ছবি
                           
বিবেকানন্দ হাউস পরিদর্শন
অবশেষে আগস্ট মাসের এক দিন আমরা সকলে মিলে ওখানে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। এক চৌমাথার কাছে অবস্থিত ছবির মত বাড়িটির চারিদিক শান্ত ও শুনসান।  বাড়ির দরজা সব সময় বন্ধ থাকে।  প্রথম দিন আমরা ওখানে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে  এমন কি দরজায় ধাক্কা মেরেও ঢুকতে পারি  নি।  অবশেষে টেলিফোনে ওখানের ভারপ্রাপ্ত স্বামীজীর সাথে যোগাযোগ করে আর একদিন ওখানে গিয়ে সবাই  হাজির হয়েছিলাম। সেদিন ওখানে অনেক ভক্তের সমাগম হয়েছিল।  আমরা সমস্ত বাড়ি ঘুরে ফিরে ওখানের অনেক ছবি  তুলে খুশি মনে বাড়ি ফিরেছিলাম।   ওখানে স্বামীজীর শয়ন কক্ষে যেটি এখন ধ্যান কক্ষ হিসেবে পরিচিত সেখানে একটি জাপানী মহিলা শিষ্য়াকে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও স্বামী বিবেকানন্দের প্রিয় গানগুলি সুললিত  কন্ঠে গাইতে শুনেছিলাম। কলকাতা থেকে আগত এক প্রাচীন স্বামীজীর সাথে দেখা হয়েছিল সেখানে এবং তাঁর কিছু মুখ নি:সৃত বাণী শোনবার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেদিন এক বিশেষ আনন্দ উপভোগ করেছিলাম। এক পুণ্য তীর্থক্ষেত্র দেখে পবিত্র হয়ে গিয়েছিল সকলের মন প্রাণ।
বিবেকানন্দ হাউসের আর একটি চিত্র 

দ্বিতীয় বারের দর্শন
প্রায় নয় বছর বাদে ২০১০ সালে আবার ছেলের কাছে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন ছেলে বাসা বদল করে পাশের শহর আর্কেডিয়াতে চলে এসেছে। এবারেও ওখানে গিয়ে দর্শনের তালিকায় স্বামীজীর ওই পুণ্য স্মৃতি বিজড়িত বিবেকানন্দ হাউস অগ্রগণ্য  ছিল।  এবারেও ওখানে গিয়ে  প্রথম বারের পুনরাবৃত্তি ঘটল।  আগে কোনো খবর না দেওয়ার ফলে বাড়িতে ঢুকতে   পারি নি।  মন:ক্ষুন্ন হয়ে বাড়ির  সামনে  পিছনে ঘুরে কিছু ছবি তুলে ফেরত এসেছিলাম। বাড়ির পিছনে আগের বইতে পড়া  সুদৃশ্য বাগানের বেশ হতদশা দেখে খারাপ লেগেছিল ।
 
বিবেকানন্দ হাউসের পিছনের বাগানে আমার পুত্রবধূ 
                         
এর পরে ওখানে ফোন করে আগস্ট মাসের আট তারিখে একটি অনুষ্ঠানের কথা শুনে ঐদিন ওখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু যেতে দেরী হয়ে যাওয়াতে সেদিনও প্রায় প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছিলাম না।  অবশেষে ওখানের তত্ত্ববধায়ক স্বামীজী আমার পুত্রবধূর সানুনয় অনুরোধে আমাদের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে উপরে বিশ্রাম নিতে চলে গেলেন। কোনো লোকজন না থাকাতে আমাদের সুবিধাই হয়ে  গেল।  আমরা মনের সুখে সমস্ত কিছু দেখে শুনে ছবি তুলে খুবই খুশি হলাম। দ্বিতল বাড়িটির  একটি সুদৃশ্য  কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটি ঢাকা দেওয়া অপ্রশস্ত রেলিং দেওয়া বারান্দা। প্রবেশ দ্বারের পাশে বড় বড় করে বাড়ির নম্বর ৩০৯ লেখা আছে।
বিবেকানন্দ হাউসের প্রবেশ দ্বার ,দ্বারের পাশেই বাড়ির নম্বর ৩০৯ 

                           

 বিবেকানন্দ হাউসের প্রবেশ সিঁড়িতে আমরা সবাই
                            
রজা দিয়ে বাড়িতে  ঢুকলেই একটি ছোট আলোকোজ্জ্বল হলঘর। এখান দিয়েই সোজা খাবার ঘরে চলে যাওয়া যায়।  হলঘরের  বাঁদিকে   স্বামীজীর বসবার ঘর। এই ঘরের সামনে গাড়ি বারান্দার দিকে আছে জানলা।    হলঘরে  ঢুকেই ডান  দিক দিয়ে দুভাজের ঘোরানো  সিঁড়ি  দ্বিতলে উঠে গেছে। ওখানেই দুটি কক্ষ আছে ,যার মধ্যে বড়টি স্বামীজীর শয়ন কক্ষ ছিল। বর্তমানে  সেটি ধ্যান কক্ষ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।  গতবারে আমরা উপরে যাবার অনুমতি পেয়ে ওগুলি দেখেছিলাম, কিন্তু এইবারে  কর্তব্যরত স্বামীজী বিশ্রাম নিচ্ছিলেন বলে ওখানে আর যাওয়া হয় নি।  স্বামীজীর বসবার ঘরের পাশেই বেশ বড়সড় একটি  দরজাহীন ঘর রয়েছে।এটি খাবার ঘর।   ওখানে স্বামীজীর লাইব্রেরী ও ডাইনিং টেবিল রয়েছে  দেখলাম।  এই খাবার  ঘরের সন্নিহিত আর একটি ঘরে রান্ধনের ব্যবস্থা ছিল।  আমরা নিরিবিলি  বসবার ঘর, খাবার  ঘর ও রান্না ঘর ভালো করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অনেক ছবি তোলা হলো।  সমস্ত ঘরেই আগের সমস্ত কিছু সব আগের মত করে রাখা রয়েছে। লাইব্রেরী ঘরে বিশাল আলমারিতে প্রচুর অমূল্য পুস্তকের  ভান্ডার রয়েছে। দেওয়ালে স্বামীজীর একটি বিশাল তৈলচিত্র রয়েছে। খাবার  ঘরের এক  কোণে স্বামীজীর ব্যবহৃত ডাইনিং টেবিল এখনো  একইভাবে রয়েছে।   এ ছাড়া দেওয়ালে তখনকার সময়ের বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য ছবি রয়েছে, যার মধ্যে তখনকার সময়ের খবরের কাগজে স্বামীজীর পাসাডেনাতে আগমনের ও বক্তৃতা দেবার খবর প্রকাশিত রয়েছে। এগুলি সম্বন্ধে পরে আরও অনেক কিছু লেখা  থাকবে। তবে অনেক ছবি পুরানো হওয়াতে সেগুলির ছবি ভালো ওঠে নি।   

বসবার ঘরের সমস্ত আসবাব এমনভাবে বিন্যস্ত অবস্থায় রয়েছে, মনে হয় যেন  এগুলি গতকালের ঘটনা। তবে সব মিলিয়ে সব কিছুতেই এক অভূতপূর্ব পরিষ্কার  পরিচ্ছন্নতার ছাপ।  সমস্ত কিছু দেখে শুনে মনে প্রাণে এক অনির্বচনীয় আনন্দের অনুভূতি হয়েছিল সেদিন আমাদের সকলের। নয় বছর আগের দেখা বাড়িটির সব কিছুই আগের মত রয়েছে দেখলাম। শুধু বাড়িটির পশ্চিম দিকে   ট্রেন চলাচলের জন্যে ট্রেন লাইন পাতা হয়েছে।  সেজন্যে ব্যস্ততা ও  কোলাহল বেড়েছে। একদিন এই  ট্রেনে করে যাবার সময় ট্রেন থেকে স্পষ্টভাবে বিবেকানন্দ হাউসকে দেখে খুশি হয়েছিলাম। 

 বিবেকানন্দ হাউসে স্বামীজীর বসবার ঘর 
                                                     


বিবেকানন্দ হাউসে স্বামীজীর বসবার ঘরের আর একটি দৃশ্য
                                   
বিবেকানন্দ হাউসে স্বামীজীর খাবার ঘর ও   লাইব্রেরী
                              
 বিবেকানন্দ হাউসে লাইব্রেরী ঘরে পুস্তক সজ্জিত আলমারী ,উপরে বুদ্ধ মূর্তি ও পাশে  চেয়ার
                                     

লাইব্রেরী  ঘরে পুস্তকের আলমারীর আর  একটি বড়ো  দৃশ্য 
                                                  
বৈঠকখানা ঘরে বহু পুরানো ফটো এবং দরজার কাছে রাখা ভিজিটরস বুক
                      
বিবেকানন্দ হাউসে স্বামীজীর রন্ধনশালা 
                                      
বিবেকানন্দ হাউসে সামনের হল ঘরের ভিতর দিয়ে খাবার ঘরের দৃশ্য
                                

খাবার ঘরের ভিতরে স্বামীজীর বিশাল তৈলচিত্র
                                             
হলঘরে ঢুকেই ডানদিকে উপরে যাবার সিঁড়ি
                                                   
বিবেকানন্দ হাউসের পিছন দিকের বাগান থেকে বাড়িটির দৃশ্য
                            
বিবেকানন্দ হাউসের পিছনের বাগানের একটি দৃশ্য 
                                   
স্বামী বিবেকানন্দের বিবেকানন্দ হাউসে আগমনের ইতিহাস 

'দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়াতে স্বামীজী' পুস্তক থেকে জানা যায় যে ১৯০০ সালের জানুয়ারী মাসের শেষের সপ্তাহে সম্ভবত ২৪শে তারিখের পরে যে কোনো  এক দিন মীড ভগ্নিত্রয়দের  বাসভবনে গিয়ে হাজির হন।  কাহিনীতে আছে : " একদিন সকালবেলা -- একটি ভাড়া -করা ঘোড়ার গাড়ি হঠাত  মীডদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো।  মীড ভগিনীগণ বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে দেখলেন যে, স্বামীজী ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামছেন এবং তাঁর তল্পিতল্পাগুলো বাড়ির দরজার কাছে নামিয়ে বলছেন :'আমি তোমাদের কাছে থাকতে এলাম। ঐ  ভদ্রমহিলার কাছে থাকা হলো বটে। ' কার বাড়ি থেকে যে স্বামীজী এমন ভাবে চলে এসেছিলেন এবং কোন তারিখে যে এই ঘটনাটি ঘটেছিল ,তা নিশ্চিত করে জানা যায় নি।  তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে , জানুয়ারী মাসের কয়েকদিন এবং গোটা ফেব্রুয়ারী মাসটা -দক্ষিণ পাসাডেনাতে মীডদের বাড়িই ছিল স্বামীজীর ঠিকানা।  এখানে থাকাকালীন এই বাড়ির পিছনের পুষ্প শোভিত বাগানে বেড়াতে যেতেন ও বাচ্চাদের সঙ্গে  সানন্দে খেলা করতেন। দ্বিতল বাড়িটি ১৮৭৭ সালের আগে নির্মিত হয়েছিল। পিচবোর্ডে আচ্ছাদিত কাঠের বাড়িটি ছিল ত্রিকোণ ছাদ  বিশিষ্ট দুতলা এবং সামনে ছিল ছাদ দেওয়া গাড়ি বারান্দা। রোদে  পোড়া রং এবং ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন ছিল এই বাড়িটি। 

স্বামী বিবেকানন্দের দ্বিতীয়বার আমেরিকা ভ্রমণের সময় নিউইয়র্ক থেকে পশ্চিম উপকুলের লস এঞ্জেলস শহরে হাজির হন তাঁর কর্মকান্ড বিস্তারের জন্যে।  সময়টি ছিল ১৮৯৯ সালের ডিসেম্বর মাস।  স্বামীজীর ভক্ত শ্রীমতী জোসেফাইন  ম্যাকলাউড এবং লস এঞ্জেলসের অধিবাসী শ্রীমতী ব্লোজেট  স্বামীজীর ওখানের বক্তৃতার ব্যবস্থা করে  দেন।  লস এঞ্জেলসের ব্লানচার্ড হলে ৮ই ডিসেম্বরের প্রথম বক্তৃতায় তিন মীড ভগিনী শ্রীমতী এলিস হ্যান্সবোরো, শ্রীমতী ক্যারী ওয়াইকফ এবং শ্রীমতী হেলেন মীড উপস্থিত  ছিলেন।  ইউনিটি চার্চে ১২ই ডিসেম্বর পরবর্তী বক্তৃতার পরের দিন শ্রীমতী  হ্যান্স বোরো এবং শ্রীমতী হেলেন মীড  শ্রীমতী ব্লোজেটের বাড়িতে স্বামীজীর সাথে একান্তে দেখা করে তাঁদের বাড়িতে তাঁদের সঙ্গে বসবাসের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীজী এই প্রস্তাব ভদ্রভাষাতে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে তিনি ঐ ভগিনীত্রয়কে তাঁর জন্যে কয়েকটি বক্তৃতার বন্দোবস্ত করতে অনুরোধ  করেন।  মীড ভগিনীরা সানন্দে ১৯শে  থেকে ২১শে  ডিসেম্বর তিনটি বক্তৃতার বন্দোবস্ত করেন। সেখানে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়েছিল। মিসেস হ্যান্সবোরো নিরাশ না হয়ে পরে পাসাডেনাতে বক্তৃতার সময়  স্বামীজীকে  এক রবিবারে নৈশ ভোজের আমন্ত্রণ জানালেন।  এই প্রস্তাবে স্বামীজী ততক্ষনাত রাজি হয়ে গেলেন এবং তাঁকে মিস ম্যাকলাউডকেও নিমন্ত্রণ জানাতে বললেন।

 বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায় যে স্বামীজী ও  শ্রীমতী ম্যাক লাউড  বড়দিনের আগের দিন ২৪ সেপ্টেম্বর মীড ভগিনীদের বাড়িতে নৈশভোজের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলেন। এই নৈশভোজের ব্যাপারে মিসেস হ্যান্সব্রো বলেছেন: " ইলেকট্রিক ট্রেনে করে আমাদের বাড়িতে আসতে তাঁদের প্রায় একঘন্টা সময় লেগেছিল। ট্রেনটি বাড়ির কাছেই একটা মোড়ে এসে দাঁড়াল ; তারপর তাঁরা কয়েক পা   হেঁটেই আমাদের বাড়ির দরজার কাছে এসে হাজির হলেন।  আমি এখনো তাঁদের সেই ছবিটি দেখতে পাই -তাঁরা বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাই তাঁরা যখন এসে হাজির হয়েছিলেন তখনই  আমি তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলাম। বাড়িতে প্রবেশ করতে করতে তিনি আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন- স্বামীজী ঘুরে ঘুরে  বৈঠক খানা ঘরে গিয়ে হাজির হলেন। ঘরের উঁচু ও প্রশস্ত জানলাগুলির  ভিতর দিয়ে আমাদের বাগানের গাছগুলি দেখা যেত।  তিনি ঐ জানলার কাছে হাজির হয়ে কয়েক মিনিট কাল সেখানে দাঁড়িয়ে বাইরের সৌন্দর্য উপভোগ করলেন। চারিদিক থেকে সূর্যের কিরণ এসে যেন তাঁকে শুভ্র পর্দার আবেষ্টনীর মধ্যে চিত্রের ন্যায় আবদ্ধ করেছিল। তারপর তিনি আমাদের দিকে ঘুরে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। আমি মিসেস ব্লজেটের বাড়িতে তাঁকে যে প্রশ্ন করেছিলাম তিনি তার জবাব দিলেন। শেষে তিনি বললেন -'হ্যা।, আমি তোমাদের বাড়িতে আবার দেখা করতে আসব !' তারপর তিনি একেবারে চলে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং শিগগির চলেও   এলেন।"
এরই ফলশ্রুতি মত স্বামীজী ১৯০০ সালের   জানুয়ারী মাসের শেষে মীড ভগিনীদের বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিলেন। এই বিষয়ে পূর্বেই বিশদ ভাবে লেখা   হয়েছে। 

৩০৯ নম্বর মন্টেরি রোডের উপর অবস্থিত মীড ভগিনীদের বাসভবনের কথা সংক্ষিপ্ত ভাবে আগেই বলা হয়েছে। স্বামীজী যখন ওই বাড়িতে থাকতে যান ,তখন ওপরের  গাড়ি বারান্দার পূর্বপ্রান্তে এবং ছাদের উপরে ছিল  ঝোপাবৃত গোলাপের বাগান -তখন প্রচুর রক্তাভ হলুদ রঙের গোলাপ ফুটেছিল -যে গোলাপের নাম " গোল্ড অফ অফির "-"বাইবেলোক্ত সুবর্ণদেশের সোনা।" 'বেদান্ত এন্ড দি ওয়েস্ট ' (নং ১৫৮) পত্রিকাতে একটি ফটোগ্রাফ ছাপানো আছে ; তাতে দেখা যাবে যে স্বামীজী বাড়িটির এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন ,আর তার পিছনে সেই গোলাপের বাগান। আর অন্যদিকে গাড়ি বারান্দার উপর একটি স্তম্ভের পেছন থেকে মিসেস ওযাইকোফ উঁকি দিয়ে দেখছেন। এই বিশেষ ফটো টিতে বাড়িটির শুধুমাত্র একটি অংশই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।
  
উপরের বর্ণিত স্বামীজীর বাড়ির সামনে দন্ডায়মান  সেই ছবি 
                           
পরের অন্য ছবিতে এত পুষ্প শোভিত বাগানের দৃশ্য দেখা যায় নি।  তখন বাগানটি তেমন সাজানো নয় এবং গোলাপের কেয়ারীরও  তেমন জৌলুস নেই।  মিসেস হ্যান্সব্রোর মেয়ে মিসেস পল কোহন  তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন; তিনি এই বাড়িতে ছোটবেলায় বহু বত্সর কাটিয়ে ছিলেন; তখন এই বাড়ির সামনে থেকে রাস্তা পর্যন্ত খুব সাজানো একটি সবুজ ঘাসের মাঠ  ছিল-আর এই মাঠের মাঝখানে ছিল বিরাট দেবদারু জাতীয় পাইন গাছ।  পরবর্তীকালে যখন মীড পরিবার এই বাড়িটি ছেড়ে চলে যান ,তখন রাস্তাটিকে চওড়া করার জন্য মাঠটি একটু ছোট হয়ে যায়।  পরের ছবিগুলিতে বাগানের গাছগুলিতে তেমন ফুলের বাহার দেখা যায় না ।  আমরাও নিজেরা বাগানের হতশ্রী দশা দেখে দু :খিত হয়েছিলাম।  এই পাইন গাছকে   পিছনে রেখে স্বামীজীর একটি ছবি বসবার ঘরে দেখেছিলাম।
 পাইন গাছের সামনে দন্ডায়মান স্বামীজী
                                    
মীড ভগিনীগণ এই বাড়িটি পরিত্যাগ করার পরে এক ভক্ত ১৯৫৫ সালে ৩০৯ নম্বর মন্টেরি রোডের বাড়িটি কিনে নিয়ে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বেদান্ত সমিতির হস্তে অর্পণ করেন। বেদান্ত সোসাইটি  ১৯৫৬ সালে খুবই যত্নসহকারে বাড়িটিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছিলেন ।  এর পরেও বাড়িটির নানাবিধ সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে।  পাসাডেনা শহরের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের  সাথে তাল রেখে ১৯৮৯ সালে বিবেকানন্দ হাউসকে সরকারী ঐতিহ্যশালী স্মারক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।  

 বাড়িটি কিন্তু বেশ বিস্ময়করভাবে ছোট -ছবিতে যেরূপ দেখা যায় ,তার চেয়ে অনেক ছোট, তবে এখন আগের চেয়ে বেশি  সুন্দর দেখায়।  শতাব্দীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত শেষ ভিক্টোরিয়ান শৈলীতে এই বাড়িটিকে সাজানো হলেও এর মধ্যে সে যুগের ঘিঞ্জি বা বদ্ধভাব নেই।  এখন এটা বেশ খোলামেলা আলো হাওয়ায় ভরা এবং সুদৃশ্য।  আকারে ছোট হলেও মনে হয় যেন   প্রচুর জায়গা   আছে।  বাস্তবিকই যে কোনো ভক্ত যদি ওই বাড়িটি দেখেন ,তাহলে তাঁর উপলব্ধি করতে  অসুবিধা হবে না যে, স্বামীজী একদিন এইসব ঘরগুলোর ভিতর চলাফেরা করতেন এবং তাঁর উপস্থিতি দিয়ে এই বাড়ির প্রতিটি স্থান ভরে রাখতেন।  আজও এই বাড়িটি স্বামীজী ও মীড ভগিনীত্রয়ের স্মৃতিরক্ষা করে চলেছে।  

বিবেকানন্দ ভবনের ভিতরের বিশদ বিবরণ পূর্বেই আমাদের ওখানে পরিদর্শনের দ্বিতীয় পর্বে আলোচিত হয়েছে। এখানে প্রামাণ্য পুস্তক অনুযায়ী স্বামীজীর ওখানে অবস্থানের সময় আরও কিছু বিবরণ দেওয়া হলো।  বাড়িটির একতলার পূর্বদিকের শেষ প্রান্তে জানলাযুক্ত একটি চোর - কুঠুরি ছিল।  স্বামীজীর সময় সেখানে একটি কমলা বাগান ছিল।  খাবার ঘরটি সমগ্র বাড়ির মধ্যে সবচেয়ে লম্বা ও বড় ঘর ছিল।  মিসেস হ্যান্সব্রোর স্মৃতি অনুসারে এই ঘরটি প্রায়ই বৈঠক খানা  হিসাবে ব্যবহৃত হত।  এই খাবার ঘরেই মীড বোনেদের বাবা মি: জেস মীডের পর্দা ঘেরা শয়ন কক্ষ ছিল।  আবার এই ঘরেই পরিবারের সকলে এবং তাঁদের অতিথিবর্গ সন্ধ্যার সময় ছোট চুল্লির আগুনে গা গরম করতেন ,কোনও কোনও সময় গল্প গুজব করতেন।  সেসব আসরে যে কোনভাবেই  হোক না কেন ,স্বামীজী উপস্থিত থাকতেন, কথা বলতে বলতে বেশ রাত হয়ে যেত।  স্বামীজীর আমলে রান্নাঘরের পেছনের দরজার দিকে ছিল আর একটি গাড়ি বারান্দা ,এরই পাশে ছিল স্নানের ঘর।  এই ছোট তিনটি ঘর এবং হলঘর -তাদের সেকোইয়া গাছের লালকাঠের দরজা - জানলা ,নানা কারুকার্যময় কাঠের কাজ এবং   উঁচু ছাদ ও বড় বড় জানলা (সামনের এবং পেছনের দুটি গাড়ি বারান্দা) -সব মিলিয়ে ছিল বাড়ির একতলা।
আমাদের বাড়িটি পরিদর্শনের দ্বিতীয় দিনে আমরা উপরের তলায় কিছু দেখতে পারি  নি।  প্রথমবারের দর্শনের সময় উপরের তলায় গেলেও অনেক লোকের ভিড়ে তেমন করে খুঁটিয়ে অনেক কিছু দেখা হয় নি এবং কাউকে ওখানের বিশদ বিবরণ  জিজ্ঞাসা করা যায় নি।  এবারে এখানে প্রামাণ্য পুস্তক থেকে দোতলার  বিবরণ জানাচ্ছি। 

বাড়িতে ঢুকেই যে হলঘর ,সেই ঘর থেকে সোজা উঠে গেছে দু-বার সমকোণে ঘেরা আর গরাদ-ওয়ালা জানলা দিয়ে আসা আলোয় আলোকিত সরু একটি সিঁড়ি পথ, যা দিয়ে দোতলার ছোট আকারের বারান্দায়  উঠে আসা যায়।  এর বাঁদিকে আছে দুখানা শোবার  ঘর - দ্বিতীয় ঘরখানা প্রথম ঘরের দ্বিগুণ বড়।  আর ডান দিকে ছিল স্নানের ঘর।  এই স্নানের ঘরের বিশেষ সুবিধা ও ব্যবস্থা নিয়ে মিসেস হ্যান্সব্রো  যে অহংকার ও গর্ব প্রকাশ করতেন ,তা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত।  হলঘরের শেষপ্রান্তে ডানদিকের কোণে একটি দরজা আছে ,যেটি দিয়ে স্বামীজীর শোয়ার ঘরে  প্রবেশ করতে হয়।  বর্তমানে এ ঘরটি হচ্ছে একটি প্রার্থনা ঘর -ঠাকুর ঘর।  এই ঘরটি আয়তনে প্রায় একাশি থেকে একশো  বর্গফুট।  ঘরে দুটি জানলা আছে -একটি পূর্বমুখী অপরটি দক্ষিণমুখী।   এই ঘরের একটি  ছবিতে পূর্ব দিকের জানলার কাছে একটি বিশাল আখরোট গাছ দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পাওয়া যায়।  দক্ষিণের জানলা দিয়ে রান্নাঘরের ছাদ দেখা যায় ,আর দেখা যায় পিছনের বাগান এবং খাড়া  উঁচু  বৃক্ষাচ্ছাদিত একটি পর্বত চূড়া।  সত্যি সত্যি এই ছোট বাড়িটি ১৯০০ সালে এই দক্ষিণ পাহাড়ের প্রায় পাদদেশেই দাঁড়িয়েছিল -তখন এই অঞ্চল ছিল অনাবাদী, বন-জঙ্গল পরিবেষ্টিত এবং জনবসতিহীন অঞ্চল।  

তখনকার দিনে দক্ষিণ পাসাডেনা শহরটি সরকারী প্রশাসনের দিক থেকে মূল পাসাডেনা থেকে পৃথক ছিল।  তখনও এখানে ঘনবসতি গড়ে নি এবং তাই মীড পরিবারের বাড়ির চারদিকে প্রচুর খোলামেলা জায়গা ছিল।  বাড়ির পিছিনে ছিল বাগান -যেখানে মি: মীড তরিতরকারি ,বেরি এবং নানা ফলের চাষ করতেন। পূর্ব দিকে ছিল কমলালেবুর বাগান  ,পশ্চিমে ছিল এক প্রতিবেশীর বাড়ি-বাড়িটি ছিল  ঝোপঝাড়  এবং বিশাল এক ওক  গাছের আড়ালে। (ওক গাছের ডালে  মিসেস হ্যান্সব্রোর মেয়ের একটি দোলনা ঝোলানো থাকত। )  তখন কাঁচা  রাস্তার পাশে মোটেও কোনো বাড়িঘর ছিল না।  যদিও ট্রাম গাড়ি কখনো কখনো রাস্তার এক পাশ দিয়ে যাতায়াত করত ,তথাপি এই অঞ্চলটি  ছিল নিস্তব্ধ শহরের নি:শব্দ একটি অঞ্চল।  তাই স্বামীজী মিসেস হ্যান্সব্রো কে বলতেন যে, তিনি অনুভব করতেন সেখানকার পরিবেশ ছিল বিশ্রামের পক্ষে উপযুক্ত এবং ঠিক ভারতবর্ষের   পরিবেশের মত।  

 এখানেই শেষ করছি এই পবিত্র পুণ্য ভবনের স্মৃতিকথার প্রথম পর্ব।এর পরের পর্বে মিসেস হ্যান্সব্রোর স্মৃতিচারণ থেকে স্বামীজী মীড পরিবারে প্রায় ছয় সপ্তাহকাল ধরে বসবাসকালে  যা কিছু করতেন -তিনি কী খেতেন ,কেমন পোশাক-আশাক পরতেন- ইত্যাদি সব কিছু নিয়ে  বিশদ আলোচনা করা হবে।  সেটি কিন্তু কম চিত্তাকর্ষক হবে না এবং স্বামীজীর  সম্বন্ধে আমাদের আরও একটি নতুন  ধারনার সৃষ্টি করবে।   

Tuesday, August 5, 2014

রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী দেবীর বিবাহোত্তর প্রাথমিক পর্ব


রবীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় এবং প্রেরণাদাত্রী নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী যখন অকস্মাত ধরাধাম থেকে বিদায় নিলেন ,তার মাত্র দুই মাস পূর্বেই রবীন্দ্রনাথের জীবনে এসে গেছেন ফুলতলি গ্রামের ভবতারিণী।  বালিকা ভবতারিণীকে 'স্বর্ণ মৃণালিনী ' হবার আশীর্বাদ করেছিলেন বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ। তারপর ভবতারিণী প্রায় উনিশ বছর  এই পরিবারের নানা স্রোতে হারিয়ে গেলেন মৃণালিনীর মধ্যে।  যদিও এই পরিবর্তন কোনও আলোড়ন আনলো না বহির্জগতে।  একটুও তরঙ্গ তুলল না প্রগতিশীলদের মনে।  তবু মৃণালিনীকে সামান্য বলতে পারা যায় না।  মাত্র দশ বছর বয়সে একহাত ঘোমটা টেনে যে ভবতারিণী ঠাকুর বাড়িতে ঢুকেছিলেন ,সেদিন তিনি বুঝতেও পারেন নি কোন বাড়িতে তাঁর বিয়ে হচ্ছে ,কাকে পেলেন তিনি। 
 শোনা যায় ,কথায় প্রচন্ড যশুরে টান থাকায় ভবতারিণী শশুর বাড়িতে এসে প্রথমদিকে  কিছুদিন কথা বলতেন না।  কবি কি এই অসম বিবাহকে খুশিমনে গ্রহণ করেছিলেন? তাই তো মনে হয়।  ছোট ছোট ঘটনায় রয়েছে সুখের আমেজ।  এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল ভবতারিণী র মৃণালিনী হয়ে ওঠার শিক্ষা।  প্রথমে তিনি মহর্ষির নির্দেশে ঠাকুর বাড়ির আদব- কায়দা -বাচন ভঙ্গীর ঘরোয়া তালিম নিলেন হেমেন্দ্রনাথের পত্নী নীপময়ীর কাছে। মতান্তরে তিনি আধুনিকা হবার তালিম নিয়েছিলেন জ্ঞানদানন্দিনীর কাছে। তবে জ্ঞানদানন্দিনীদের  সার্কুলার রোডে অবস্থিত বির্জিতলাওয়ের বাড়ি জোড়া সাঁকো র বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে হওয়াতে এই মত সম্বন্ধে সন্দেহ থেকেই যায়, উপরন্তু  এতে মহর্ষির কোনো অনুমোদন ছিল না।  তারপরে নীপময়ীদের মেয়েদের সঙ্গে মৃণালিনী পড়তে গেলেন লরেটো হাউসে। লোরেটোতে তাঁকে অন্যান্য ছাত্রীদের সঙ্গে না পড়িয়ে স্বতন্ত্র শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করা হয়।  এই শিক্ষা দানের ব্যবস্থা যে মহর্ষির নির্দেশে হয়েছিল ,তা জানতে পারা যায় মহর্ষির  রবীন্দ্রনাথকে লিখিত চিঠি অনুসারে। বিবাহের দু  মাস পরে ৭ই ফাল্গুন ১২৯০ চুচুড়া থেকে দেবেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন -'প্রাণাধিক  রবি,ইংরাজি শিক্ষার জন্যে ছোট বৌকে লোরেটো  হৌসে পাঠাইযা দিবে। ক্লাসে অন্যান্য ছাত্রীদের সহিত একত্র না পড়িয়া তাহার স্বতন্ত্র শিক্ষা দেবার উত্তম বন্দোবস্ত হইয়াছে। তাহার স্কুলে যাবার কাপড় ও স্কুলের মাসিক বেতন ১৫ টাকা সরকারী খরচ হইতে পড়িবে।'  এই নির্দেশানুসারে মৃণালিনী দেবীর জন্য বিদ্যালয়ের পরিচ্ছদ তৈরী হয়েছে ,প্রায় এক বছর (১৮৮৪ খৃ :-১৮৮৫ খৃ :)তিনি লোরেটো স্কুলে ইংরাজি পড়েছেন।  কেবল ইংরাজি নয়-পত্নীকে সংস্কৃত শেখাবার জন্য আদি ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য পন্ডিত হেমচন্দ্র বিদ্যারত্নকে নিয়োগ করেন। বিদ্যা রত্নের কাছে মৃণালিনী দেবী রামায়ণের অনুবাদ করেছেন ,ভাসুর পুত্র বলেন্দ্রনাথের সাহায্যে ইংরাজি বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্যের সঙ্গে সুপরিচিত হয়েছেন। হেমচন্দ্র বিদ্যা রত্ন ও বলেন্দ্রনাথের কাছে মৃণালিনী  দেবীর সংস্কৃত অধ্যয়নের পরিচয় পাওয়া যায় রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত একটি পাযনিয়ার্স একসারসাইজ বুক থেকে। ওই খাতায় কবিপত্নীর স্বহস্তে লিখিত রচনাগুলি তাঁর অনুবাদ চর্চার নিদর্শন। 

ফুলতলির ভবতারিণী হয়ত হারিয়ে গেলেন কিন্তু মৃণালিনী অতি আধুনিকা হয়েও ওঠেন নি কিংবা তার স্কুলের ইংরাজি শিক্ষা ,পিয়ানো শিক্ষা, সঙ্গীতের শিক্ষা, বাড়িতে হেমচন্দ্র বিদ্যা রত্নের কাছে সংস্কৃত শিক্ষা কোনও সৃষ্টিমূলক কাজেও লাগেনি।
অনুবাদ চর্চা , ভাষা শিক্ষা ও সাহিত্যরসের মাঝেই আবার মৃণালিনী দেবী পরিবারের অন্যান্য বধূদের সঙ্গে অভিনযে যোগ দিয়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরজিতলাও-এর বাড়িতে রাজা ও রানীর প্রথম অভিনয়ে নারায়ণীর ভূমিকায় নেমেছিলেন কবিপত্নী।  মৃণালিনী দেবীর এই প্রথম অভিনয়েই তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন,'নারাযণীর ভূমিকায় মৃণালিনী দেবী নথ নেড়ে  ঝাঁটা ঘুরিয়ে যে অভিনয় করেছিলেন তা নাকি বেশ প্রাণবন্ত হয়েছিল।' তবু রবীন্দ্রনাথের নাটকে কিংবা অভিনয়ে যোগ দেবার আগ্রহ মৃণালিনীর ছিল না ,একথা স্বীকার করতেই হবে।  'সখিসমিতি' কিংবা 'মায়ার খেলা' র ছোটখাট চরিত্রাভিনয়ে যোগ দেওয়া ছাড়া আর কিছুতেই তাঁকে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায় নি।  আসলে গান-অভিনয়-সাহিত্যচর্চার মধ্যে মৃণালিনীর  প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্বামীর মহত আদর্শকে পরিণত করবার জন্যে তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের পাশে এসে দাঁড়ালেন ,শুধু তখনি তাঁর প্রকৃত পরিচয় আমরা পেলাম। সামান্যার  মধ্যে দেখা দিলেন অসামান্যা। দেখা দিল সনাতন ভারতবর্ষের শাশ্বত নারী।
 
      ঠিক সুগৃহিণী বলতে যা বোঝায় ,ঠাকুর বাড়ির মৃণালিনী ছিলেন তাই।  ব্যক্তিত্বময়ী এবং অভিমানিনী জোড়া সাঁকোতে সবার ছোট ,তবু সবাই তাঁর কথা শুনতেন। তিনিই ছিলেন জোড়াসাঁকো বাড়ির প্রকৃত গৃহিণী।  সকলের দিকে তাঁর  সমদৃষ্টি ছিল ,তিনি সকলের দু:খে দু:খী ,সকলের সুখে সুখী। তাঁকে কোনদিন কর্তৃত্ব করতে হয় নি ,ভালবাসা দিয়ে সকলের মন হরণ করেছিলেন। সেইজন্যে ছোটরা যেমন তাঁকে ভালবাসত , বড়রা তেমনি স্নেহ  করতেন। ঠিক একই কথা অমলা দাস ও প্রফুল্লময়ী দেবী লিখেছেন -'বলুর বিবাহে খুব ঘটা হয়েছিল। -- আমার ছোট জা মৃণালিনী দেবীও সঙ্গে যোগ দিয়ে নানারকম ভাবে সাহায্য করেন। তিনি আত্মীয়স্বজনকে লইয়া আমোদ-আহ্লাদ করিতে ভালবাসিতেন।  মনটা খুব সরল ছিল ,সেজন্যে বাড়ির সকলে তাঁকে খুব ভালবাসিতেন।' ইন্দিরা দেবী লিখেছেন -'কাকীমা খুব মিশুকে ছিলেন এবং পরকে আপন করার ক্ষমতা ছিল।'  অমলা দাশ লিখেছেন-'সংসারে আমার বন্ধুর সংখ্যা খুবই কম।  কাকিমার মত বন্ধু আমার আর নাই, আর হবার সম্ভাবনাও নাই।  কোনো রকমে মনে কষ্ট হলে ,কোনো অশান্তি হলে দৌড়ে যাবার আর দ্বিতীয় স্থান নাই।'  এমনকি রবীন্দ্রনাথের কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী জোড়াসাঁকো বাড়িতে জলগ্রহণ করতেন না-তাঁর ধারণা ছিল মাসোহারা এক হাজার টাকা দেবার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যে মহর্ষি তাঁর প্রাণ নাশ করতে পারেন। তাই জল গ্রহণে তাঁর অনীহা। কিন্তু মৃণালিনী দেবী তাঁর প্রিয় পাত্রী হওয়াতে তাঁর হাতের তৈরী  মিষ্টি খাবার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারেন  নি।

আগেই বলা হয়েছে মৃণালিনী দেবী সবাইকে নিয়ে আমোদ-আহ্লাদ করতেন ,বউ দের সাজাতেন কিন্তু নিজে সাজতেন না। কবিপত্নী স্বভাবত অতিরিক্ত সাজ সজ্জার অনুরাগী ছিলেন না, গয়না পরতেন নিতান্ত সামান্য।  বড় ঘরের বউ তার তুলনায় তিনি সাধারণ বেশেই থাকতে ভালবাসতেন।  উপরন্তু কবির রুচির প্রভাব তাঁকে আরও সাধাসিধা করে তুলেছিল।  বিলাস বর্জন উপকরণ বর্জন একমাত্র বুলি ছিল সে সময় কবির, মুখে মেয়েদের কৃত্রিম উপায় অবলম্বনে রূপসৃষ্টি ,চোখ ধাঁধানো রঙ বেরঙের প্রজাপতি প্যাটার্নে সাজ সজ্জা ও অলংকার বহুলতার আড়ম্বরের প্রতি ধিক্কার দিতেন।  কবি প্রতি কথায় বলতেন -অসভ্য দেশের মানুষরাই মুখ 'চিত্তির' করে।  মুখে রঙ মেখে মেয়েরা কি অসভ্য দেশের মানুষ সাজতে চায়?

সমবয়সীরা অনুযোগ করলে বলতেন, 'বড় বড় ভাসুর-পো  ভাগ্নেরা চারদিকে ঘুরছে -আমি আবার সাজব কি?'একদিন কানে দুটি দুল ঝোলানো বীর বৌলি পরেছিলেন সবার উপরোধে।  সেইসময়ে হঠাত কবি সেখানে উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি দুই কানে দুহাত চাপা দিয়ে বীর বৌলি লুকিয়ে ফেলেছিলেন। গয়না পড়ায় এতই ছিল তাঁর লজ্জা। এই সাজগোজের ব্যাপারে মৃণালিনী দেবীর অনীহার আর একটি মজার ঘটনা না উল্লেখ করে পারছি না।
মৃণালিনী দেবী ছিলেন হেমলতা ঠাকুরের সমবয়সী।  তাই মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তাঁর বেশ ভাব জমেছিল পরে।  রবীন্দ্রনাথের বিবাহের তিন মাস পরের একটি ঘটনার কথা তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন।  রবীন্দ্রনাথের বিবাহের তিন মাস পরে স্বর্ণকুমারী দেবীর বড় মেয়ে হিরন্ময়ী দেবীর বিবাহ হয়।  হেমলতা দেবী বিবাহে নিমন্ত্রিত হয়ে জোড়াসাঁকোতে গিয়েছিলেন।  সেই সময়ে কলকাতা মিউজিয়ামে প্রদর্শনী খুলেছে নতুন।  সেই প্রথম কলকাতায় প্রদর্শনীর প্রচলন।  সেই প্রদর্শনীতে জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সঙ্গে মৃণালিনী দেবীও যাবেন।  বাসন্তী রঙের জমিতে লাল ফিতের উপর জরির কাজ করা পাড় বসানো শাড়ী পড়েছেন কাকিমা। তাঁকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে।  কথায় বলে বিয়ের জল গায়ে পড়লে মেয়েরা সুন্দর হয়ে বেড়ে ওঠে।  সেই রোগা কাকিমা দিব্যি দোহারা হয়ে উঠেছেন তখন।  রবীন্দ্রনাথ কোথা থেকে এসে পড়লেন সেই সময় সেইখানে হাতে প্লেটে কয়েকটা মিষ্টি নিয়ে খেতে খেতে।  কাকিমাকে ঐভাবে সুসজ্জিত বেশে দেখে দুষ্টুমি করে গান জুড়ে দিলেন তাঁকে অপ্রস্তুত করার জন্য -'হৃদয় কাননে ফুল ফোটাও ,/ আধো  নয়নে  সখী, চাও চাও।'  এগার বছরের বালিকা বধূ মৃণালিনী দেবীর এই বাসন্তী রং -এর বসন খানি রবীন্দ্র স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।  তাই কবি শেষ যৌবনের অকাল বসন্তের আষাড়ে ক্ষণিকায় 'সোজাসুজি ' লিখলেন -'বাসন্তী রং বসন খানি/ নেশার মতো চক্ষে ধরে।' বৃদ্ধ বয়সে পত্রপুট বারো  সংখ্যাতে লিখলেন -'বুকে উঠল জাফরাণি রঙের আঁচল /তখন ঝিকিমিকি বেলা ' .

        তিনি আরও ভালবাসতেন রান্না করতে, আর পাঁচ জনকে ভালোমন্দ রেঁধে খাওয়াতে।পলীবালিকা ভবতারিণী যখন ঠাকুর পরিবারের বধূ হয়ে এলেন , মনে হয় তখন  থেকেই তাঁর রান্নার প্রতি সহজাত অনুরাগ ছিল।  ঠাকুরবাড়ির এই বনেদী পরিবেশে এবং স্বামীর সস্নেহ সান্নিধ্য এবং অনুপ্রেরণাতে  মৃণালিনী দেবীর রন্ধন কার্যে দিন দিন নৈপুণ্য বৃদ্ধি পেতে  থাকে।  হেমলতা দেবী লিখেছেন-কবিপত্নীর রান্নার হাত ছিল চমত্কার।  নোনতা খাবার ও ব্যঞ্জনাদি স্বাদে গন্ধে তাঁর হাতে বেশ উতরে যেত।  আর তাঁর  বিভিন্ন মিষ্টান্ন যারা খেয়েছেন ,তারা সেগুলির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কবির জন্যে প্রায়ই  ঘরে নানানতরো মিষ্টান্ন তৈরী করতেন নিজের হাতে।  তাঁর তৈরি মানকচুর জিলিপি , দইয়ের মালপো ,পাকা আমের মিঠাই, চিড়ের পুলি যাঁরা একবার খেয়েছেন তাঁরা আর ভোলেন নি।  হাতের কাছে কোনো সরঞ্জাম না পেয়ে একবার সুন্দর গাজরের হালুয়া তৈরি করে নাটোরের মহারাজাকে খাইয়ে খুব প্রশংসা লাভ করেছিলেন। মৃণালিনী দেবীর রন্ধন নৈপুণ্যের কথা রবীন্দ্রনাথ খোলা মনে হেমন্তবালা দেবীকে পত্রে উল্লেখ করেছেন।
নতুন নতুন রান্না  আবিষ্কারের সখ কম ছিল না কবিরও। বোধ হয় পত্নীর রন্ধন কুশলতা এ সম্বন্ধে তাঁর সখ বাড়িয়ে দিত বেশি।  রন্ধনরতা পত্নীর পাশে মোড়া নিয়ে  বসে  নতুন রান্নার  ফরমাশ করতে দেখা গেছে অনেক সময় কবিকে।  শুধু ফরমাশ দিয়ে ক্ষান্ত হতেন না, নূতন মালমশলা দিয়ে নূতন প্রণালীতে পত্নীকে নূতন রান্না শিখিয়ে কবি সখ মেটাতেন।  শেষে তাঁকে রাগাবার জন্যে গৌরব করে বলতেন,'দেখলে তোমাদের কাজ তোমাদেরই কেমন একটা শিখিয়ে দিলুম। ' তিনি চটে গিয়ে বলতেন,'তোমাদের সঙ্গে পারবে কে? জিতেই আছ সকল বিষয়ে।' এই সব ছোটখাট ব্যাপারে লক্ষ্য করা যায় তাঁদের দুজনের ভিতরের গভীর সম্পর্ক।

বন্ধুবান্ধব নিয়ে খাওযাদাওযা গান সাহিত্য আলোচনার আসর বসাতে কবি খুবই ভালবাসতেন। এই সব আসরে বন্ধু সমাগম কম  হত না। প্রায়ই বন্ধুবান্ধবকে মধ্যাহ্নভোজনের নিমন্ত্রণ করে বেমালুম ভুলে যেতেন। এই ভ্রান্তিমূলক নিমন্ত্রণ বিভ্রাটের জন্যে মৃণালিনী দেবী নানা রকম মিষ্টান্ন তৈরী করে রাখতেন যাতে এরূপ বন্ধু সমাগমে খাদ্য বিভ্রাট না ঘটে।  কবিপত্নীর প্রিয় বান্ধবী অমলা দাশের ভগ্নী উর্মিলা দেবী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন- ' মৃণালিনী দেবী রান্না করে মানুষ খাইয়ে বড় তৃপ্তি পেতেন।  তাঁর দাদা চিত্তরঞ্জন দাস যখন রবীন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে যেতেন তখন সিঁড়ি থেকেই বলতে বলতে উঠতেন ,সেদিন কী কী খাবেন।  মৃণালিনী দেবীও তক্ষুনি  রানাঘরে সেটা তৈরি করতে বসতেন।' তিনি আরও লিখেছেন-'কবির একটা অভ্যাস ছিল ,সিঁড়ি থেকে সুউচ্চ কন্ঠে ছোট বউ ছোট বউ করে ডাকতে ডাকতে উঠতেন।  আমার ভারি মজা লাগত শুনে, তাই বোধহয় আজও মনে আছে। ' ( রবীন্দ্রনাথ যে সুর করে মৃণালিনী দেবীকে ডাকতেন সেটা পূরবী কাব্যের 'আশা' কবিতায় লিখে গেছেন।) রথীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন- 'জোড়াসাঁকো  বাড়িতে যেদিন খামখেয়ালি সভার অধিবেশন বসত সেদিন রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনী দেবীকে নতুন ধরনের রান্নার নির্দেশ দিতেন।  ফরমাশ করতেন  যেন প্রতিটি পদের বৈশিষ্ট্য থাকে -মামুলি কিছু চলবে না। ' বলা বাহুল্য কবিপত্নী অভিনব আহারের আয়োজন করাতে সমর্থ হয়েছিলেন সেবারে।

ঠাকুর বাড়িতে নতুন বউ দের গৃহকর্মে নানারকম তালিম দেওয়া হত।  তাদের শিক্ষা শুরু হতো পান সাজা দিয়ে। তারপর তাঁরা শিখতেন বড়ি  দিতে, কাসুন্দি- আচার প্রভৃতি তৈরী করতে।  ধনী পরিবারের বউ হলেও এসব শিক্ষায় ত্রুটি ছিল না।  বলা বাহুল্য মৃণালিনী  এসব কাজে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।  তবে এ সময় দিন বদলাচ্ছে। পালাবদল চলছে বাড়ির বাইরে,বাড়ির ভিতরেও।  না বদলালে কি জ্যোতিরিন্দ্র - কাদম্বরী তিনতলার ছাদে 'নন্দন কানন' তৈরী করতে পারতেন? সে সভায় অনাত্মীয় পুরুষেরাও অবাধে আসতেন ,অথচ সত্যেন্দ্র -বন্ধু মনমোহনকে অন্ত:পুরে আনতে কম কাঠ খড় পোড়াতে হয়নি।  যুগ বদলাচ্ছে।  মৃণালিনী যখন লোরেটো স্কুলে পড়তে গেলেন তখন আর কেউ ধিক্কার দিতে এলো না।  অবশ্য অন্দর মহলের ব্যবস্থা বদলাতে বড় দেরী হয়।  যাই যাই করেও গ্রীষ্মকালের শেষ-সূর্যের আলোর মতো মেয়েদের চিরকালের অভ্যেস যেন যেতে চায় না।  তাই বাইরের জগতে কয়েকটি মেয়ে পরিবর্তন আনলেও ঠাকুরবাড়ির মেয়ে- বউ রা তখনও শিখতেন ঝুনি-রাইয়ের ঝাল কাসুন্দি, আমসত্ত্ব ,নারকেল চিঁড়ে তৈরি  করতে।

     রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের সাংসারিক জীবনের সুখের ছবি বন্ধুবর প্রিয়নাথ সেনকে লেখা চিঠিপত্রে ধরা আছে।  বিবাহের পরেই কবি প্রিয়নাথ সেনকে চিঠিতে লিখেছেন-প্রিয় বাবু,  Honey moon কি কোনকালে একেবারে শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে -তবে কিনা Moon-এর হ্রাস বৃদ্ধি পূর্ণিমা অমাবস্যা আছে বটে।  অতএব আপনি Honey moon -এর কোনো খাতির না রেখে হঠাত এসে উপস্থিত হবেন।  আর এক চিঠিতে লিখেছেন -আমার নূতন গৃহ প্রতিষ্ঠা হয়েছে,আজ নানা কারণে আপনার দর্শন প্রার্থনীয়-নিরাশ করবেন না।  ১৪ নং চিঠিতে রয়েছে-আমরা যশোর বেড়াতে গিয়েছিলাম।  সম্প্রতি যশোর থেকে এসেছি - আপনি ও নগেন্দ্রবাবুকে সঙ্গে করে একদিন এখানে আসতে চেয়েছিলেন তার কি হলো? কবে আসবেন ? আর এক চিঠিতে লিখেছেন-আজ বিকালে আপনি একবার এদিকে আসবেন?নগেন্দ্রবাবু আজ এখানে আসবেন। আজ আপনার যদি কোনো বাধা না থাকে তবে আমাদের এখানে সন্ধ্যাবেলায় আহারের নিমন্ত্রণ রইলো।  শুভ উত্তরের অপেক্ষায় রইলুম।  এই রকমই ছিল দুজনের প্রথম দিকের বন্ধু বান্ধব পরিবৃত আপন সাংসারিক সুখের ছবি।

ফুলতলী গ্রামের পল্লীবালিকা ভবতারিণীর সাথে রবীন্দ্রনাথের  বিবাহের পর থেকেই দুজনের দাম্পত্য জীবন সুখের সাথেই শুরু হয়েছিল বলে  অনুমান করা যায়।  ভবতারিণী মৃণালিনীতে পরিবর্তিত হইবার পরে রবীন্দ্রনাথের স্নেহ সান্নিধ্যে এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শীঘ্রই ঠাকুরবাড়ির যোগ্য হয়ে উঠেছিলেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।  বিভিন্ন ঘটনার ভিতর দিয়ে তাদের ছোট ছোট সুখের পরিচয় পাওয়া যায়।  বিবাহের পরে প্রথমবার রবীন্দ্রনাথের যশোরের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা বন্ধুবর প্রিয়নাথ সেন মহাশয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন।  নববধূকে নিয়ে কবি যখন ফুলতলির গ্রামের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই বহুদিন পূর্বের দেখা গ্রাম্য পথের বর্ণনা দিয়েছেন এই ভাবে -'যেন অনেকদিনের দেখা একটা রুদ্র রঞ্জিত মাঠ ,শীতলস্নিগ্ধ বাতাস পুষ্করিণীর ধার দিয়ে বাঁকা গ্রামের পথ, ঘট কক্ষ অবগুন্ঠিত বধূ এবং সেই সঙ্গে ওই সর্ষে খেতের মৃদু সুগন্ধে অনুপ্রবিষ্ট একটি উদার নির্মল আকাশ মনে পড়ে -যেন কোনো এক সময়ের পরিতৃপ্ত প্রেম এবং পরিপূর্ণ শান্তির সুখস্মৃতি ওই সর্ষেফুলের গন্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ' আবার ক্ষণিকায় ওই সর্ষে খেতের মৃদু সুগন্ধের সঙ্গে নববধূকে নিয়ে যশোর যাত্রার সুখস্মৃতি বিলম্বে মনে পড়েছে বলে 'বিলম্বিত ' কবিতায় লিখেছেন-'তখন ছিল সর্ষে-খেতে /ফুলের আগুন লাগা ,/ তখন আমি মালা গেঁথে /পদ্মপাতায় ঢেকে /পথে বাহির হয়েছিলাম /রুদ্ধ কুটির থেকে।' রবীন্দ্রনাথ প্রথম যৌবনে নব কৈশোরের অক্লিষ্ট অমলিন প্রেমমালা নিয়ে যখন নববধূর সঙ্গে গ্রামে যান ,সেই সময় মাঠে মাঠে সর্ষে ফুল ফুটে সমস্ত মাঠ গুলিতে যেন ফুলের আগুন লেগে পাকা সোনার রং ধারণ করেছিল।  তাই রবীন্দ্র জীবনীতে নবযৌবনের দেখা এই অবহেলিত সর্ষে ফুল ও সর্ষে খেতের সুগন্ধি ই কবির পরিতৃপ্ত প্রেমের সঙ্গে নববধূকে নিয়ে যশোর যাত্রার পরিপূর্ণ সুখ ও শান্তির স্মৃতি জড়িয়ে আছে যা ক্ষণিকার 'বিলম্বিত' কবিতায়, প্রান্তিক ৭সংখ্যক ,ও ছিন্নপত্র ২৪৯ সংখ্যাকে লিখে গেছেন।

    পারিবারিক ভাবে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন করেছেন কবির অন্তরঙ্গ দুই রমণী।  প্রথম জন  হলেন রবীন্দ্রনাথের পরম স্নেহের ভাগ্নী সরলা দেবী।  সরলা দেবী লিখেছেন-' মামার জন্মোত্সব প্রথম আমি করাই।'  এই   উত্সবে ধূতি চাদর ও ফুলের মালা দিয়ে একান্ত ঘরোয়াভাবে সরলা দেবীর উদ্যোগে  ৪৯ নং পার্ক স্ট্রীটে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে জন্মোত্সব পালন করা হয়।  শ্রীশ মজুমদারকে কবি লিখেছেন-'আজ আমার জন্মদিন- পঁচিশ বত্সর পূর্বে এই পঁচিশে বৈশাখ আমি ধরণীকে বাধিত করে অবতীর্ণ হয়েছিলুম।' তখন মৃণালিনী দেবীর  বয়স মাত্র  বার বছর।  কবি জীবনের এই আনন্দ উচ্ছ্বাস মুখরিত সংসার পর্বের প্রথম ভাগে চতুর্দশী মৃণালিনী দেবী খুব আড়ম্বরের সঙ্গে সাতাশের কবির দ্বিতীয় জন্মোত্সব পালন করেন। তারপর থেকে প্রতি বছর আমৃত্যু পর্যন্ত নিয়মিত ভাবে এই জন্মদিন  পালন করতেন। বর্তমানে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের যে উত্সব দেশে বিদেশে পালিত হয় ,তার প্রথম সূত্রপাত করে গিয়েছিলেন মৃণালিনী দেবী।  এই জন্মদিনে কবিপত্নী কবিকে সোনার বোতাম উপহার দেন।  রবীন্দ্রনাথ পুরুষের সোনা পরাটাকে লজ্জাজনক বলে আপত্তি করায় কবিপত্নী সে বোতাম ভেঙে ওপেল বসানো বোতাম গড়িয়ে দিলেন।  সে বোতামও দু-চার বার পরেছিলেন যেন দায়ে পড়ে।  জন্মদিনের এই হঠাত উপহার পেয়ে কবি মুখে আপত্তি করলেও মনে মনে কিন্তু দারুণ  খুশী হয়েছিলেন  যা সেজুতির জন্মদিন কবিতায় ও শ্রীশ মজুমদারকে চিঠিতে লিখে গেছেন।  তাই দেখা যায় লাজুক রবীন্দ্রনাথের মুখের কথাও সব সময়ে সত্য হয় না।  সত্য ভাষণ সব লিখে গেছেন কবিতায় (ছিন্নপত্র ৯৪ নং) 'ছুটির যজ্ঞে পুষ্প হোম জাগলো বকুল শাখা /ছুটির শূন্যে ফাগুন বেলা মেলল সোনার পাখা।/ ছুটির কোণে গোপনে তার নাম /আচমকা সেই পেয়েছিল মিষ্টি সুরের দাম ,/(উপহার) কানে কানে সে নাম ডাকার ব্যথা উদাস করে / চৈত্র  দিনের স্তব্ধ দুই প্রহরে। ' (জন্মদিন- সেজুতি ) এই জন্মদিন কবিতায় কবি প্রচ্ছন্নভাবে 'ছুটি' অর্থাত ছোট বউ -এর পত্র পুষ্প উপহার দিয়ে খুব জাঁক জমকের সঙ্গে বন্ধু- বান্ধব আত্মীয় স্বজন নিয়ে জন্মদিনের উত্সব পালনের কথা স্মরণ করেছেন যা বৃদ্ধ বয়সেও ভোলেন নি।  এই আনন্দ মুখরিত জীবনের আরম্ভ-বেলাকার সাতাশে কবি পশ্চিম যাত্রীর ডায়েরিতে একটু অন্যভাবে লিখলেন -এখন ভাবনা ধরিয়ে দিলে আমার আসল  পরিচয়  কোন  দিকটায় সেই আরম্ভ -বেলাকার সাতাশের দিকে,না, শেষ বেলাকার? এই আরম্ভ বেলাকার সাতাশের জন্মদিনের উত্সব কবির জীবনের একটি স্মরনীয় দিন।  কারণ চতুর্দশী মৃণালিনী দেবী সাতাশের কবির জন্মদিনের উত্সব পত্রপুষ্প আলোক ও সমীরণের মধ্যে আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে খুব জাঁক জমকের সঙ্গে উদযাপিত করে কবিকে প্রথম অর্ঘ্য দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে তুমি আজ সাতাশে পড়েছ !! এই সাতাশের কবির কাছে দেশবাসীর অনেক প্রত্যাশা ! তাই ২৭সে জুলাই ১৮৮৭ খ্রি : শ্রীশ মজুমদারকে লিখলেন -'হঠাত একদিন বৈশাখের প্রভাতে নববর্ষের নূতন পত্রপুষ্প আলোক ও  সমীরণের মধ্যে জেগে উঠে  যখন শুনলুম -আমার বয়স সাতাশ তখন আমার মনে এই সকল কথার উদয় হল।'  এই হলো কবির প্রথম সাতাশের জন্মদিনের কাহিনী।  আর শেষ সাতাশের (১৮৯৭খ্রি:-১৯২৪ খ্রি:) ঋণগ্রস্ত কবি যখন কল্যাণ কর্মের উদ্বোধন করলেন ,(১৩০৭ শিলাইদহ) তখন একমাত্র মৃণালিনী দেবী তাঁর কল্যাণ কর্মের প্রেরণাদাত্রী  হয়ে কবিকে 'একটুখানি টিপ ' পরিয়ে  দিয়ে কবির নবজীবনের উদবোধন করলেন। (১৯০০ খ্রি: -১৯০২ খ্রি:) অনাদৃত কবিকে আরম্ভ বেলাকার সাতাশে এবং শেষ বেলাকার সাতাশে এই দুই সাতাশে প্রথম অর্ঘ্য দিলেন কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী ,এবং সেই সময় মৃণালিনী দেবী ই ছিলেন কবির কল্যাণ কর্মের একমাত্র উত্সাহদাত্রী এবং নিজেও সেই কর্মযজ্ঞে যোগ দিয়েছিলেন।
এই   প্রসঙ্গে কবি মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছিলেন- 'মেয়েদের প্রধান কাজ Inspire করা।  পুরুষ বা মেয়ে উভয়েই অসম্পূর্ণ ,উভয়ে মিলিত হলে একটা সম্পূর্ণতা আসে ,জীবনে তার গভীর প্রয়োজনীয়তা।  --পুরুষ তার কর্মক্ষেত্রে সবল দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে   পারে না, যদি না নারী তার অমৃত দিয়ে পূর্ণ করে তাকে। দু 'জনের মিলনে যে একটা circle সম্পূর্ণ হলো ,যদি তা না হত তাহলে যে একটা বিশেষ ক্ষতি তা হয়ত নয় ,কিন্তু সেই হওয়ার দ্বারা একটা বিশেষ পূর্ণতা জীবনের।  মেয়েদের সেই কাজ, পুরুষের যথার্থ সঙ্গিনী হওয়া জীবনের মুক্তক্ষেত্রে ।  -- সেই শিখা না হলে আলো যে জ্বলত না ,তাই হৃদয়ের সেই শিখা জ্বালানো চাই।  -- কিন্তু সে মিলন তখনি যথার্থ বড় মিলন হয়, যখন সে একটা মহত্তর জীবনের মধ্যে প্রেরণা  আনে।  গন্ডীবদ্ধ আঁচল চাপা দেওয়া জীবনে সে যেন ব্যর্থ না হয়।  যেখানে পুরুষ মহত ,যেখানে সে কর্মের দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়েছে ,সেখানে তাকে নিয়ত জাগ্রত রাখা কম কাজ নয়।

 উপরিল্লিখিত তথ্যগুলির ভিত্তিতে এটি সহজেই প্রতীয়মান হয় যে রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী  বিবাহের পরের প্রাথমিক পর্বগুলি বেশ সুখ শান্তি ও উভয়ের প্রতি ভালবাসা ও নির্ভরতার মাধ্যে অতিবাহিত হয়েছিল।  ব্যতিক্রম শুধু একটি ঘটনা ,যেটি আকস্মিক ভাবে ঘটে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের জীবনে এক শূন্যতা ও শোকের আবহ তৈরি করে তাঁকে শোকাকুল ও দিশাহার করে দিয়েছিল। বিবাহের মাত্র দুই মাসের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় ও অন্তরঙ্গ নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন। কাদম্বরী দেবীর এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু কবিকে বেশ কিছুদিনের জন্যে উদ্ভ্রান্ত করে রেখেছিল।  এই স্নেহময়ী নারীই কবির শৈশবে নিজের স্নেহ মমতা ও ভালবাসা দিয়ে কবির জীবনকে অভিষিক্ত করে রেখেছিলেন, কৈশোর জীবনের কাব্যতরণীকে ঠেলে দিয়েছিলেন পূর্ণতার লক্ষ্যে।  তিনিই ছিলেন কবির কাব্যের প্রেরনাদাত্রী নারী। শৈশবে মাতৃহীন  বালককে স্নেহ মমতা দিয়ে মানুষ করেছিলেন বলে রবীন্দ্র নাথ তাঁর উপর খুবই নির্ভর করতেন ,এবং কবি তাঁকে সমাদরের আসনে বসিয়েছিলেন। নতুন বৌঠানের এই মর্মান্তিক মৃত্যুই কবির সুকুমার ও অনুভূতিপ্রবণ মনকে বেশ কিছুদিনের জন্যে দিশেহারা ও উন্মনা করে দিয়েছিল।  শেষ সপ্তক ত্রিশ সংখ্যক কবিতায় কবি লিখেছেন, কবির অসংখ্যের মধ্যে একটি মাত্র নারী কাদম্বরী দেবীর সাথে তাঁর স্বভাবের ও মনের মিল ছিল।  দুজনেই কবি প্রকৃতির,পরিহাস প্রিয় চঞ্চল ও কৌতুক প্রিয় ছিলেন। কাদম্বরী ছিলেন স্নেহময়ী,করুণাময়ী,অনুভূতিপ্রবণ ও আবেগ প্রবণ।  এই আবেগ প্রবণতার জন্যেই সন্তানহীনা এবং স্বামী সোহাগে বঞ্চিতা ,মনে মনে একাকিনী মুহুর্তের আবেগে নিজের সীমারেখা লঙ্ঘন করে দিশেহারা হয়ে কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন।  এই সময় মৃণালিনী দেবীর বয়স মাত্র দশ বছর দুই মাস এবং রবীন্দ্রনাথের চব্বিশ।  তাই কবি শেষ সপ্তক ত্রিশ সংখ্যায়  লিখে গেছেন- 'চোখে ছিল /একটা দিশাহারা ভয়ের চমক/ পাছে কেউ পালায় তাকে না বলে / তার দুটি পায়ে ছিল দ্বিধা  /ঠাহর পায়নি / কোনখানে সীমা / তার আঙিনাতে।  '
রবীন্দ্রনাথ নিজেও ছিলেন আবেগপ্রবণ ,সেজন্যে নতুন বৌঠানের আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি শোকে পাগলপারা হয়ে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর অব্যবহিত পরে রাত্রে বাড়ি ফিরে  সারা রাত ধরে তিনতলার ছাদে পায়চারি করেছেন আর নতুন বৌঠানকে চারিদিকে খুঁজে বেরিয়েছেন, আকুল স্বরে তাঁকে একবারের জন্যে দেখা দিতে বলেছেন। সাথে সাথে তাঁর প্রিয় গান গেয়ে গেছেন সারা রজনী। কাদম্বরী দেবীর প্রতি তরুণ হৃদয়ানুরাগই তাঁর জীবনের গভীরতম উপলব্ধি এবং কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুই রবীন্দ্র জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনতলার ছাদ , তিনতলার জ্যোতি দাদা  ও নতুন বৌঠানের  থাকবার ঘর ও সারা বাড়ির আনাচে কানাচে নতুন বৌঠানের খোঁজে পাগলের মত ঘুরে বেরিয়েছেন। এমন কি মাঝে মাঝে বাড়ির বাইরেও চলে যেতেন এবং আবার অবসন্ন হযে  বাড়িতে ফিরে এসে সেই অনুসন্ধান। এর ফলশ্রুতি কিছুদিনের মধ্যে বন্যার স্রোতের মত বিভিন্ন কথিকা, গান ও কবিতা কাদম্বরীর উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল। এর মধ্যে সব চেয়ে উল্লেখ যোগ্য জীবন স্মৃতিতে প্রকাশিত 'মৃত্যু শোক ' কথিকা এবং পুষ্পাঞ্জলী প্রবন্ধ সংগ্রহ। 'জীবনস্মৃতি' তে "মৃত্যুশোক" অধ্যায়ে কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু কবিমানসে কী সুগভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তার আলোচনা প্রসঙ্গে কবি বলেছেন ,"জগতকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্যে যে দূরত্বের প্রয়োজন মৃত্যু সেই দূরত্ব ঘটাইয়া   দিয়াছিল। আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার উপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম তাহা বড় মনোহর। " 
    এই চব্বিশ থেকে কবির শেষ জীবন আশী বছর পর্যন্ত অজস্র কবিতায় ও গানে শুধু নতুন বৌঠানের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। তবে কবির নাতজামাই কৃষ্ণ কৃপালনী কবি মানসে কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে বক্তব্যে বলেছিলেন, "It did not break him ,it made him "
কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুই রোমান্টিক রবীন্দ্রনাথকে মহাকবি রবীন্দ্রনাথে রূপান্তরিত করেছে। এই মরণের বৃহৎ  পটভূমিকাতেই কবি জীবন ও জগতের সত্যরূপকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখার মহাকবি - দৃষ্টি লাভ করলেন।

   কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যাজনিত রবীন্দ্র জীবনের এই এই বিপর্যয় ও দিশাহারা অবস্থায়  নবপরিণীতা গ্রাম্য পল্লীবালিকা মৃণালিনী দেবী ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন।  তাঁর এই সময়ের মনের অবস্থাও রবীন্দ্রনাথ কিছুটা অনুধাবন করেই লিখে গেছেন -'তোমারে সবলে আঁকড়িয়া  ,-হিয়া কাঁপে থর থরে/ দু:খদিনের  ঝড়ে।' অর্থাত   কাদম্বরী দেবীর এই অকস্মাত মৃত্যুর বিপর্যয়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ যেমন দিশাহারা হয়েছিলেন তেমনি ভীত গ্রাম্য 'বালিকা  বধূ' মৃণালিনী দেবীও এই 'দু:খ দিনের ঝড়ের ' মধ্যে ভয়ে দিশাহার হয়ে রবীন্দ্রনাথকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন।

     কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর পরে রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'কড়ি ও কোমল।'এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি মোটামুটি ১২৯০ সালের ফাল্গুন-চৈত্র  থেকে ১২৯৩ সালের আশ্বিন-কার্তিক পর্যন্ত কাল সীমার মধ্যে রচিত হয়ে সংকলিত হয়েছে। অর্থাত 'মৃত্যুশোক' -এর প্রথম আড়াই বত্সরের কাব্যফসল 'কড়ি ও কোমল। '
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, "কড়ি ও কোমলে  যৌবনের রসোচ্ছ্বাসের সঙ্গে আর একটি প্রবল প্রবর্তনা প্রথম আমার কাব্যকে অধিকার করেছে, সে জীবনের পথে মৃত্যুর আবির্ভাব।  যাঁরা আমার কাব্য মন দিয়ে পড়েছেন তাঁরা নিশ্চয়ই লক্ষ করে থাকবেন এই মৃত্যুর নিবিড় উপলব্ধি আমার কাব্যের এমন একটি  বিশেষ ধারা নানা বাণীতে যার প্রকাশ।  'কড়ি ও কোমল' -এই তার প্রথম উদ্ভব।  সেজন্যে কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের প্রথম অংশে রয়েছে কাদম্বরী দেবীর (পুরাতন) মৃত্যুশোকের  কবিতা আর শেষ অংশে রয়েছে 'পঞ্চদশী '(তনু) নিরুপমা 'নতুন' -এর (মৃণালিনী দেবী) উদ্দেশ্যে নববসন্তের গান।
তাই এর কিছুদিনের মধ্যেই কবি মৃত্যুকে পশ্চাতে রেখে জীবনের দিকে মুখ ফিরয়ে নেন, এবং
নূতন'র উদ্দেশ্যে (মৃণালিনী  দেবী) রচনা করেন 'তুমি' যা পরিশেষে দেখা দেয় 'তুমি' আর 'আমি' রূপে।  কবির এই নব যৌবনের শরৎ কালের প্রচ্ছন্ন প্রেরণায় 'দেহে'র আকর্ষণের 'মোহ'  নানা বর্ণে ও রূপে কড়ি ও কোমলের আদিরসাত্মক কবিতায় প্রথম ফুটে উঠেছিল 'পূর্ণ মিলন'  'দেহের মিলন' কবিতায়।  কবি কড়ি ও কোমল সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন -'যৌবন হচ্ছে জীবনে ঋতুপরিবর্তনের সময় যখন ফুল ও ফসলের প্রচ্ছন্ন প্রেরণা  নানা বর্ণে ও রূপে অকস্মাত বাহিরে প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে, কড়ি ও কোমল আমার সেই নবযৌবনের রচনা।'

 এবারে  বাস্তব সংসারের সংস্পর্শে আসার দরুণ কবির  ভাষা ও ছন্দ  নাপ্রকার রূপ ধরে উঠবার চেষ্টা করছে। কবির যৌবনে মৃণালিনী দেবীর আবির্ভাবে কবির কাব্যের ও সাহিত্যের যেমন শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ঘটেছিল তেমনি কবির জীবনের শ্রেষ্ঠ বিকাশও হয়েছিল।  এই সময়টা অর্থাত ১৮৮৪ সাল থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত কবির কাব্যের স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করা  যায় , এবং এই সময়  বহু গান গল্প কবিতা নাটক ও উপন্যাসের উত্স স্থান।  কবির এই নবযৌবনের রসোচ্ছ্বাস  কেবল যে মানব জীবনের বিচিত্র রসলীলা কবির মনকে আকৃষ্ট করেছিল তা নয়, সেই সঙ্গে কবির চিত্রকলা গান গল্প কবিতা সবই যেন একসঙ্গে কবির অন্ত:স্থলের উত্স থেকে আপনি উত্সারিত হচ্ছিল।  তাই নবযৌবনের শরৎ কালে অথবা সংসার পর্বের প্রথম অধ্যায়ের বর্ণনায় কবি লিখেছেন- 'মনে পড়ে দুপুর বেলায় জাজিম বিছানো কোণের ঘরে একটা ছবি আঁকার খাতা লইয়া ছবি আঁকিতেছি।  সে-যে চিত্রকলার কঠোর সাধনা তাহা নহে-সে কেবল ছবি আঁকার ইচ্ছাটাকে লইয়া আপন মনে খেলা করা।  যেটুকু মনের মধ্যে থাকিয়া গেল ,কিছুমাত্র আঁকা গেল না  সেইটুকুই ছিল তাহার প্রধান অংশ। ' নব যৌবনের শরৎ কালের আর একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কবির গান ও ছবি আঁকা।  এই প্রথমে তিনি ছবি আঁকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।  কবির মনের এই ছবি আঁকার গোপন ইচ্ছাটির  প্রধান অংশ হচ্ছে মৃণালিনী দেবীর ছবি আঁকা।  সেই সময় স্বল্প কয়েকটি মৃণালিনী দেবীর ছবি এঁকেছিলেন।, কিন্তু লজ্জা ও সংকোচের জন্যে মৃণালিনী দেবীর আরও বেশি ছবির রূপ দিতে পারেন নি, মনের ইচ্ছা মনেই রয়ে গেল।  কিন্তু পরবর্তীকালে বৃদ্ধ কবি অতীতের  সেই গোপন ইচ্ছাটির প্রধান অংশটির রূপ দিলেন - ঘোমটা ঢাকা অশরীরী বিষন্ন নারীমূর্তিরূপে এবং তারই  সঙ্গে আঁকলেন নিজের বেদনার্ত মুখ।  আর, দুজনের মুখের উপরে ফেললেন অতীতের সেই দুর্লভ সন্ধ্যার লোহিত সাগরের সূর্যাস্তের রং ,যে রঙ কবির ভালোবাসামুগ্ধ হৃদয়ের মধ্যে মধ্যে চিরদিনের জন্য অঙ্কিত হয়ে রয়ে গেছে। এরই বিশদ বিবরণ রয়েছে ৩০ আগস্ট ১৮৯০ সালের য়ুরোপ -যাত্রীর ডায়ারিতে।  

এখানেই শেষ হলো এই পর্ব