রবীন্দ্রনাথের বিবাহের গল্প বহুবার বহু জায়গাতে আলোচিত ও চর্চিত হয়েছে। খুবই অনাড়ম্বর ভাবে এই বিবাহ সম্পন্ন হলেও সমস্ত কিছু নিয়ম কানুন মানা হয়েছিল। ঠাকুর বাড়ির সবাই এই বিবাহে খুবই আনন্দ করেছিলেন , ব্যতিক্রম শুধু একজন। তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি। তবুও বিবাহের আগে মেয়ে দেখার সময়ের কিছু কৌতুকজনক ঘটনা পুনরায় স্মরণ করা যেতে পারে।
১৯৩৮ সালের ২১সে মে সর্বপ্রথম উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকা মংপুতে তাঁর স্নেহধন্যা মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেই সময় কথা প্রসঙ্গে মৈত্রেয়ী দেবী কবিবরকে তাঁর বিবাহের গল্প শোনাতে অনুরোধ করেন।
তাতে রবীন্দ্রনাথ বলে ওঠেন, "আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই। বৌঠানেরা যখন বেশি পেড়াপেড়ি শুরু করেন। আমি বল্লুম ,তোমরা যা হয় কর ,আমার কোনো মতামত নেই। তাঁরাই যশোরে গিয়েছিলেন ,আমি যাইনি। আমি বলেছিলাম ,আমি কোথাও যাব না, এখানেই বিয়ে হবে। জোড়াসাকোতে হয়েছিল। "
তাতে রবীন্দ্রনাথ বলে ওঠেন, "আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই। বৌঠানেরা যখন বেশি পেড়াপেড়ি শুরু করেন। আমি বল্লুম ,তোমরা যা হয় কর ,আমার কোনো মতামত নেই। তাঁরাই যশোরে গিয়েছিলেন ,আমি যাইনি। আমি বলেছিলাম ,আমি কোথাও যাব না, এখানেই বিয়ে হবে। জোড়াসাকোতে হয়েছিল। "
"সে কি, আপনি বিয়ে করতে যশোরে যাননি ?"
"কেন যাব ? আমার একটা মান নেই?"
"ভীষণ অহংকার !"
"তা হোক,তাঁরা তোমাদের মত আধুনিকা তো ছিলেন না, এসেছিলেন তো !"
রবীন্দ্রনাথের প্রথাগত বিবাহের মেয়ে দেখতে যাওয়ার আগে আরো দু একটি জায়গাতে পাত্রী দেখার কথা হয়েছিল। সেগুলো বেশ মজার ও তথ্যের দিক দিয়ে ভারী আকর্ষক। রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীকেই পরিহাসছলে একটি মেয়ের দেখা সবিস্তারে বলেছিলেন। তাঁর কথায় , "জানো একবার আমার একটি বিদেশী অর্থাত অন্য province-এর মেয়ের সঙ্গে বিয়ের কথা হয়েছিল। সে এক পয়সাওয়ালা লোকের মেয়ে ,জমিদার আর কি ,বড় গোছের। সাত লক্ষ্ টাকার উত্তরাধিকারিণী সে। আমরা কয়েকজন মেয়ে দেখতে গেলুম ,দুটি অল্পবয়সী মেয়ে এসে বসলেন- একটি নেহাত সাদাসিধে ,জড় ভরতের মত এক কোণে ব'সে রইলো ; আর একটি যেমন সুন্দরী ,তেমনি চটপটে। চমতকার তাঁর স্মার্টনেস। একটু জড়তা নেই,বিশুদ্ধ ইংরাজি উচ্চারণ। পিয়ানো বাজালে ভালো -তারপরে music সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হ'ল। আমি ভাবলুম এর আর কথা কি? এখন পেলে হয়!-এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকলেন। বয়স হয়েছে,কিন্তু সৌখীন লোক. ঢুকেই পরিচয় করিয়ে দিলেন মেয়েদের সঙ্গে। সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন ,-'Here is my wife' এবং জড়ভরতটিকে দেখিয়ে 'Here is my daughter'--আমরা আর ক'রব কি, পরস্পর মুখ চাওয়া চাওযি ক'রে চুপ ক'রেই রইলুম ; আরে তাই যদি হবে তবে ভদ্রলোকদের ডেকে এনে নাকাল করা কেন! যাক , এখন মাঝে মাঝে অনুশোচনা হয়। -- যাহোক ,হ'লে এমনই কি মন্দ হ'ত। মেয়ে যেমন ই হোক না কেন, সাত লক্ষ টাকা থাকলে বিশ্বভারতীর জন্যে তো এ হাঙ্গামা করতে হ'ত না. তবে শুনেছি সে মেয়ে নাকি বিয়ের বছর দুই পরেই বিধবা হয়। তাই ভাবি ভালই হয়েছে ,কারণ স্ত্রী বিধবা হলে আবার প্রাণ রাখা শক্ত। "
সীতা দেবীও কবির কাছে শুনেছিলেন সেই ঘটনা ,"পুন্যস্মৃতি ' তে জানিয়েছেন' এক মান্দ্রাজি জমিদার কি রকম ভাবে তাঁহাকে কন্যাদান করিবার চেষ্টায় ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন ,সে গল্প শুনিলাম। গল্প শেষ করিয়া বলিলেন, ,'সে বিয়ে যদি করতুম তা হলে আর আজ কাছে দাঁড়াতে পারতে? সাত লাখ টাকা আয়ের জমিদারির মালিক হয়ে, কানে হীরের কুণ্ডল পরে, মান্দ্রাজে বসে থাকতুম ,তা না এখন two ends meet করতে পারিনে ,বসে বসে কবিতা লিখছি। '
সাত লাখ টাকার উত্তরাধিকারিণীকে 'মদ্রজা' কে যে ঠাকুরবাড়ির কেউ পছন্দ করেন নি , রবীন্দ্রনাথের বড় দা দ্বিজেন্দ্রনাথের বহুপঠিত কবিতাটি তার প্রমাণ :
---' অনিন্দিতা স্বর্ণ- মৃণালিনী হোক
সুবর্ণ তুলির তব পুরস্কার। মদ্রজার কারে
যে পড়ে সে পড়ুক খাইয়া চোক। '
এ কবিতা লেখা হয় যে বছর অগ্রহায়ণ মাসে রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিল ,সেই বছরেরই জৈষ্ঠ মাসে।
রবীন্দ্রনাথের দৌহিত্রী নন্দিতার স্বামী কৃষ্ণ কৃপালনী রবীন্দ্রজীবনী লেখার সময়ে মাদ্রাজের মেয়ের পরিবর্তে ওড়িশার একটি মেয়ের উল্লেখ করেছেন।
ওড়িশায় ঠাকুর বংশের জমিদারী ছিল ,কাজেই সেখানকার আর এক জমিদার সুদর্শন কবিকে জামাতা করতে চাইলে অবাক হবার কিছু নেই। তিনি আরও লিখেছেন,জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ দুই ভাই মিলে রাজবাড়িতে মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। তবে এর থেকে আর বিশেষ কিছু জানা যায় নি এই বিবাহের সম্বন্ধের ব্যাপারে।
ওড়িশায় ঠাকুর বংশের জমিদারী ছিল ,কাজেই সেখানকার আর এক জমিদার সুদর্শন কবিকে জামাতা করতে চাইলে অবাক হবার কিছু নেই। তিনি আরও লিখেছেন,জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ দুই ভাই মিলে রাজবাড়িতে মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। তবে এর থেকে আর বিশেষ কিছু জানা যায় নি এই বিবাহের সম্বন্ধের ব্যাপারে।
অপরদিকে আসামের জমিদার জানদাভিরামের আত্মজীবনী 'মোর কথা ' থেকে পাচ্ছি একটি খেদোক্তি। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ,'ভগবানের কি ইচ্ছা ! কবি-গুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বড় দিদির বিয়ে হলো না, কিন্তু বড় দিদির ছোট ভাই আমার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞ দার্শনিক বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের মেজ ছেলে অরুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা লতিকা দেবীর বিয়ে হয় ১৯০৬ সালের ১লা জুলাই। মানুষের মতের কত পরিবর্তন হয়। এই বিয়ে আবার বড়দিদি স্বর্ণলতা দেবী ই দিয়েছিলেন। তার পর ঠাকুরবাড়িতে কত বিধবা বিবাহ হচ্ছে। ' ঊষারঞ্জন ভট্টাচার্য মহাশয় তাঁর 'রবীন্দ্রনাথ ও অসম ' গ্রন্থে জ্জানদাভিরামের এই উক্তি অবলম্বন করেই জানিয়েছেন , 'জ্জানদাভিরামের রচনা ' 'মোর কথা' থেকে জানা যায় তাঁর দিদি স্বর্ণলতা দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ-সম্বন্ধ হয়েছিল।
কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ যখন জানলেন যে এই সুন্দরী ও সুশীলা পাত্রীটি বিধবা তখন আর এগোতে রাজী হলেন না। কবির সঙ্গে জ্জানদাভিরামের হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ,ফলে কবি তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে বহুবার কৌতুক করেছেন। শুধু তাই নয় 'ছবি তোলার প্রস্তাব হতেই কবি কৌতুকের সুরে ইরাকে বললেন, তোর পিসিকে তো পাইনি ,তুই কাছে থাকলে ছবি তোলায় আপত্তি নেই.' লিখেছেন শ্রী ভট্টাচার্য।
কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ যখন জানলেন যে এই সুন্দরী ও সুশীলা পাত্রীটি বিধবা তখন আর এগোতে রাজী হলেন না। কবির সঙ্গে জ্জানদাভিরামের হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ,ফলে কবি তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে বহুবার কৌতুক করেছেন। শুধু তাই নয় 'ছবি তোলার প্রস্তাব হতেই কবি কৌতুকের সুরে ইরাকে বললেন, তোর পিসিকে তো পাইনি ,তুই কাছে থাকলে ছবি তোলায় আপত্তি নেই.' লিখেছেন শ্রী ভট্টাচার্য।
এবারে প্রশ্ন , রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে স্বর্ণলতার বিবাহ সম্বন্ধ কবে উঠেছিল ? শ্রী ভট্টাচার্যের মতে, দেবেন্দ্রনাথের প্রাথমিক অনুমোদন থাকলেও পাত্রী বিধবা বলে তিনি পরে আপত্তি জানান। কিন্তু লক্ষীনাথ বেজবরুয়ার তাঁর জীবনস্মৃতিতে জানিয়েছেন, স্বর্ণলতা বিধবা হন ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ৩১সে মার্চ আর তাঁর পুনর্বিবাহ হয় ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই ফেব্রুয়ারি। লক্ষিনাথ ছিলেন বিয়ের অন্যতম সাক্ষী। তা ছাড়া এই সময়ে কবিপত্নী জীবিত ছিলেন ,রবীন্দ্রজীবনে তিনি এসেছিলেন ১৮৮৩ সালের ৯ই ডিসেম্বর ,বিদায় নিয়েছিলেন ১৯০২ সালের ২৩সে নভেম্বর। তাহলে?
ইরা জানিয়েছেন, এর প্রতিটি ঘটনাই সত্যি। তবে স্বর্ণলতার সঙ্গে কবির বিয়ের কথা হয়েছিল ১৮৮৩ সালের কোনও এক সময়ে,তখন স্বর্ণলতার একবারও বিয়ে হয় নি। রায়বাহাদুর গুণাভিরাম বরুয়া ছিলেন উদারহৃদয় ব্যক্তি ,'আসামবন্ধু ' র প্রতিষ্ঠাতা -সম্পাদক। সুকিয়া স্ট্রীটের অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদ্যোগে বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। ১৮৯৯ সালে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। স্ত্রী ব্রজসুন্দরীর অকাল প্রয়াণের পরে তিনি দুই সন্তানের জননী বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিবাহ করেন।
স্বর্ণলতা এঁদেরই কন্যা। অত্যন্ত রূপসী স্বর্ণলতা বেথুন স্কুলে পড়তেন ও পরবর্তীকালে লেখিকা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকেই প্রথম মহিলা সাংবাদিকের মর্যাদা দেওয়া হয়। ষোলো বছর ধরে তিনি এসোসিয়েটেড প্রেসে সংবাদ সরবরাহ করেন। ঠাকুরবাড়ির উতসবে তিনি পিতা গুণাভিরামের বরুয়ার সঙ্গে এসেছিলেন এবং তখনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বিবাহ-সম্বন্ধ হয়। এই প্রস্তাবে কবির অনুমোদন ছিল , হয়ত সেই সম্ভাবনাতেই দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথ খুশি হয়ে কবিতায় লিখেছিলেন ' অনিন্দিতা স্বর্ণ- মৃণালিনী হোক সুবর্ণ তুলির তব পুরস্কার। 'কিন্তু অনুসন্ধানের পরে মহর্ষি যখন শুনলেন , স্বর্ণলতা বিধবার সন্তান তখন সম্বন্ধ ভেঙে যায়।
স্বর্ণলতার সঙ্গে কবির বিবাহ প্রস্তাবটির কথা কেউ কখনও বলেননি, সম্ভবত কবি নিজে তা সংগোপনে রেখেছিলেন বলে। পরে শুধু জ্জানদাভিরাম ও তাঁর মেয়ে ইরার সঙ্গে এ নিয়ে কৌতুকের সুরে কথা বলতে শোনা গিয়েছে। যে সময়ে তিনি ইরাকে তার পিসির কথা তুলে ঠাট্টা করেছেন ,মনে রাখতে হবে ,তখন স্বর্ণলতাও আর ইহলোকে নেই. তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৩২ সালে। জ্জানদাভিরাম তাঁর দিদিকে খুব ভালবাসতেন ,তাই সেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ের সঙ্গে যখন তাঁর বিয়ে হল ,তখন দিদির বিয়ে না হওয়ার কথাটি বিশেষ করে মনে পড়েছিল। আসলে ঠাকুরবাড়িতে মহর্ষি বিধবা বিবাহের বিপক্ষে থাকায় জ্জানদাভিরামের সঙ্গে লতিকার বিয়ে হয় মহর্ষির মৃত্যুর পরে। স্বর্ণলতার আগ্রহেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ে লতিকা বরুয়া পরিবারে বধূ হয়ে আসেন।
পূর্বোল্লিখিত দুইটি পাত্রী দেখার সম্ভাবনা নাকচ হবার পরে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ নিয়ে তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল।তখন বাড়ির অভিভাবকেরা এই বঙ্গের উপযুক্ত জায়গা থেকে পাত্রী দেখার সিদ্ধান্ত নেন। অবনীন্দ্রনাথের ঘরোয়া বইটিতে তাঁর স্মৃতিকথায় তিনি লেখেন, 'রবিকাকার বিয়ে আর হয় না; সবাই বলেন,বিয়ে করো -বিয়ে করো এবারে, রবিকাকা রাজি হন না, চুপ করে ঘাড় হেঁট করে থাকেন। শেষে তাঁকে তো সবাই মাইল বুঝিয়ে রাজি করালেন। ' এ ব্যাপারে মহর্ষির নিশ্চয়ই কিছু চাপ ছিল এবং সেজন্যে তিনি সেপ্টেম্বর মাসে কবিকে মুসৌরিতে ডেকে পাঠান। রবীন্দ্রনাথ মুসৌরিতে যাবার কিছুদিন পরেই তাঁর বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয় এবং সেরেস্তার কর্মচারী অভয় চরণ ঘোষকে যশোরে পাঠানোর সংবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে তেমন কোনো খোঁজ খবর না পাওয়াতে রবীন্দ্রনাথের বৌদিরা দলবেধে মেয়ে দেখতে যান যশোর খুলনাতে।
এই মেয়ে দেখার দলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কি না, সেই বিষয় নিয়ে মতান্তর আছে. রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন তিনি কনে দেখতে যান নি ,কিন্তু ইন্দিরা দেবী চৌধারিণী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন কনে দেখার দলে তাঁর 'রবিকাকা' -ও ছিলেন। অবশ্য দু'জনেই তাঁদের শেষ জীবনে স্মৃতিচারণ করেছেন-কারো একজনের বিভ্রম ঘটা অস্বাভাবিক নয়। কবির বৌঠানেরা অর্থাত জ্জানদানন্দিনী দেবী, কাদম্বরী দেবী , জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, বালক সুরেন্দ্রনাথ ও বালিকা ইন্দিরা ও সঙ্গে একুশ বাইশ বছরের নব যৌবনের কবিকে নিয়ে পাত্রীর সন্ধানে জ্জানদানন্দিনী দেবীর বাপের বাড়ি নরেন্দ্রপুর গ্রামে আশ্রয় নেন। ইন্দিরা দেবীর মামার বাড়ি মাটির বাড়ি, খড়ের চাল, উঁচু রোযাক। মাটির আঙিনা। আশেপাশে বাগান-পুকুর।
এখানেই বালিকা ইন্দিরা তাঁর জ্যোতিকাকা ও রবি কাকার কাছে ঘড়ি-দেখা শিখলেন। মা-কাকীরা পাত্রী খুঁজতে এ-পাড়া ও-পাড়া যান, আর দুই কাকা বাড়িতে শিশুদের সঙ্গ দেন. প্রায়ই তাঁরা রবীন্দ্রনাথের জন্যে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কনে দেখতে গেলেও ,তাঁদের পছন্দমত একটি সুন্দরী পাত্রীও খুঁজে পেলেন না। যশোরে পিরালী ব্রাহ্মণদের একটা আড্ডা ছিল,তাই জোড়া সাঁকোর বৌয়েরা অধিকাংশ সেখান থেকেই আসতো। তাদের সুন্দরী বলে একটা নাম ছিল. কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় নির্বাচক মন্ডলীর কাছে কোনো সুন্দরী নজরে পড়ল না। দক্ষিণ ডিহি ,চেঙট প্রভৃতি সব পাড়া খুঁজেও মনের মত মেয়ে পেলেন না। অবশেষে খুলনা জেলার দক্ষিণে ডিহি ফুলতলা গ্রামের বেনীমাধব রায়্চৌধুরীর একমাত্র কন্যা ফুলি ওরফে ভবতারিণী কে মনোনীত করা হলো।
শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ নিজেও পাত্রীকে মনোনীত করেছিলেন। তবে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল মন্তব্য করেছিলেন, ' রবীন্দ্রনাথ স্বেচ্ছায় একটি দশ বছরের কম প্রায় অশিক্ষিতা মেয়েকে ভাবী জীবনসঙ্গিনী মনোনীত করবেন একথা বিশ্বাস করা কঠিন।' ভবতারিণীর গাত্রবর্ণ শ্যামলা ছিল এবং তাঁকে সুন্দরী বলা চলে না। কবি কনের এই শ্যামলা রংটিকেই পছন্দ করেছিলেন। পরে কবিতায় সেই ভাব প্রকাশ করেছিলেন এই ভাবে, 'যে দেখায় সে আমার মন ভুলিয়েছে / তাতে আছে যেন এই মাটির শ্যামল অঞ্জন ,/ ওর কচি ধানের চিকণ আভা। ' বিবাহের সময় ভবতারিণীর বয়স ছিল নয় বছর নয় মাস, জন্মতারিখ ১লা মার্চ,১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ। কবি কনের পিতৃগৃহের পরিচয় অথবা কনে দেখার বিবরণ কাউকেই বলেননি ,কিন্তু পরিহাসছলে বলে গেছেন শাশুরির ১০৮ পদ রান্নার কাহিনীটি। আর কাব্যে উপন্যাসে কনের পিতৃ গৃহের পরিচয় ও গ্রাম্য পথের বিবরণ লিখে গেছেন। 'ধরাতলে দীনতম ঘরে/ যদি জন্মে প্রেয়সী আমার ,নদীতীরে / কোন -এক গ্রাম্ প্রান্তে প্রচ্ছন্ন কুটিরে / অশ্বত্থ ছায়ায় ,সে বালিকাবক্ষে তার / রাখিবে সঞ্চয় করি সুধার ভান্ডার / আমারি লাগিয়া সযতনে। ' অর্থাত ফুলতলি গ্রামের প্রান্তদেশে নদীর ধারে অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় যে কুটির রয়েছে ,সেই দীনতম ঘরের বালিকাকেই কবি দেখতে গিয়েছিলেন।
ইন্দিরা দেবী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে যশুরে মেয়েদের মধ্যে সাধারণ গুণের ও তাঁদের মিশুকে ও পরকে আপন করার ক্ষমতা ভবতারিনীর মধ্যে পূর্ণভাবে প্রকাশিত হতে দেখেছিলেন। আর তাঁর রবিকাকার এই অসম বিবাহের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, 'রবিকাকার মত অমন গুণবান ,রূপবান ,ভাগ্যবান, ধনবান, খ্যাতিমান (ভবিষ্যতের মত না হলেও যথেষ্ট ) যুবাপুরুষ , গুরুজনেরা যে মেয়েকে হাতে তুলে দিলেন , বিনা বাক্যব্যয়ে নির্বিবাদে কী করে তাকেই বিয়ে করতে রাজি হলেন ও পরে সুখে স্বচ্ছন্দে ঘর করতে লাগলেন, ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। অথচ আজকাল কত কথা শোনা যায় যে ,স্ত্রী শিক্ষিতা নাহলে শিক্ষিত স্বামীর সঙ্গে মিশ খাবে কী করে ইত্যাদি। সেকালে ওঁদের স্ত্রীরা সে হিসাবে কে-ই বা স্বামীর উপযুক্ত ছিলেন ? অথচ ওঁরা সর্বদা তাঁদের যথেষ্ট মেনে চলতেন, গৃহলক্ষীর সম্মান দিতেন।'
কনে দেখার পালা সঙ্গ করে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রী কাদম্বরী দেবী , দিদি সৌদামিনী , জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মস্থল বম্বের কারোয়ারে যান। কারোয়ার থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ,কাদম্বরী দেবী ও রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতায় ফিরে আসার পরেই রবীন্দ্রনাথের বিবাহের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। এরই ফলশ্রুতি স্বরূপ ১৮৮৩ খ্রীস্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর বিবাহের দিন ধার্য হয়। তবে এই বিবাহে জ্জানদানন্দিনী দেবী ও সৌদামিনী দেবী কারয়ারে থেকে যাওয়ায় বিবাহে অনুপস্থিত ছিলেন। ঠিক এই সময়ে আকস্মিক সৌদামিনী দেবীর স্বামী শ্রী সরদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়ে বিবাহ বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। অন্যদিকে প্রথমে উতসাহ ও উদ্দেপনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় নতুন বৌঠান পাত্রী দেখতে গেলেও , কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বিবাহ সমারোহে যোগ দেন নি। এই সব কারণে কবি নিজেকে অনাদৃত বলে উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় অত্যন্ত সাধারণ ভাবে। কোনো জাঁকজমক হয় নি।
অথচ রবীন্দ্রনাথ শৈশব থেকেই এই বিশেষ দিনটির স্বপ্ন দেখতেন। কারণ শৈশবে কৈলাশ মুকুজ্জের সালঙ্কারা বধূর বিবাহের উতসবের বর্ণনা বালক বয়সে শুনেই সেটিকেই যুবক রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ের গোপন লালন করে এসেছিলেন। তাই তাঁর বিবাহ জাঁক -জমকের সঙ্গে হয়নি বলে চিরকাল কবির মনে আক্ষেপ ছিল। সেই আক্ষেপ মাঝে মাঝে আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রকাশ করতেন। সেজন্যে মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীকে বিয়ের ব্যাপারে বলেছিলেন, 'আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই। --- নিজের বিয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই, সে কথা উত্থাপণ মাত্র হেসে উড়িয়ে দেবে ,অথচ পরের বিয়ের পদ্য লেখ।' কবির মনের এই গোপন আকাঙ্খা তাঁর আকাশ প্রদীপ কাব্যের 'বধূ' কবিতায় সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন।তবে কবির ইচ্ছামত পাত্রী ভবতারিণীকে জোড়া সাঁকোতে সুসজ্জিত করে এনে বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়।
তবুও আনন্দের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নিজের বিবাহের এক অভিনব নিমন্ত্রণপত্র নিজের হাতে লিখে প্রিয় বন্ধু প্রিয়নাথ সেন ও অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবকে পাঠিয়েছিলেন। এই পত্রটির মাথায় ভোরের পাখির প্রথম আবির্ভাবের সঙ্গে সূর্যোদয়ের ছবির নীচে মধুসূদন দত্তের কবিতা 'আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হয়' -লিখে তারই পাশে লিখলেন ' আমার Motto নহে। '
প্রিয় বাবু,
আগামী রবিবার ২৪ অগ্রহায়ণ তারিখে শুভদিনে শুভলগ্নে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ বিবাহ হইবেক। আপনি তদুপলক্ষে বৈকালে উক্ত দিবসে ৬নং জোড়াসাঁকোস্থ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভবনে উপস্থিত থাকিয়া বিবাহদি সন্দর্শন করিয়া আমাকে এবং আত্মীযবর্গকে বাধিত করিবেন।
ইতি
অনুগত
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটি সূত্রে জানা যায় , রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভবতারিণীর বিবাহের ঘটকালি করেন কবির মাতুল ব্রজেন্দ্রনাথ রায়ের পিসিমা আদ্যাসুন্দরী দেবী। প্রচলিত ঠাকুরবাড়ির রীতি অনুসারে রবীন্দ্রনাথের আইবুড়ো ভাত অবনীন্দ্রনাথের বাড়িতেই হয়। অবনীন্দ্রনাথের মা রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী ভবতারিণীর সম্পর্কে বোন হন ,তাই তিনি এই বিবাহে খুব খুশী হয়েছিলেন।
অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায় আছে-
'মা গায়ে হলুদের পরে রবিকাকাকে আইবুড়ো ভাতে নেমন্তন্ন করলেন।অবনীন্দ্রনাথের বড় পিসিমা কাদম্বিনী দেবীর ঘরে আইবুড়ো ভাত সাজানো হয়। মা খুব খুশি,ভবতারিণী একে যশোরের মেয়ে তায় সম্পর্কে বোন। বিরাট আয়োজন।পিসিমারা রবিকাকাকে ঘিরে বসেছেন ,এ আমাদের নিজের চোখে দেখা। রবিকাকা দৌড়দার শাল গায়ে, লাল কি সবুজ রঙের মনে নেই তবে খুব জমকালো রঙ চঙের। বুঝে দেখো, একে রবিকাকা , তায় ওই সাজ ,দেখাচ্ছে যেন দিল্লীর বাদশা! তখনই ওঁর কবি বলে খ্যাতি ,পিসিমারা জিজ্ঞাসা করছেন ,কি রে, বউ দেখেছিস ,পছন্দ হয়েছে ,কেমন হবে বউ ইত্যাদি সব। রবিকাকা ঘাড় হেঁট করে বসে একটু একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছেন,আর লজ্জায় মুখে কথাটি নেই।'
কবি নিজের বিবাহের গল্প কারো কাছে করেন নি কিন্তু কবিতায় টুকরো টুকরো ভাবে বিবাহের স্মৃতি কথা লিখে গেছেন যেমন-'ক্ষণিক মিলনের' দুইখানি দিশেহারা মেঘের বর্ণনার পিছনে রবীন্দ্র মৃণালিনীর অকস্মাত বা দৈব ঘটিত মিলন কাহিনী যা কাব্যে বহুবার হয়েছে। সানাই-এর 'হঠাত মিলন' বা অকস্মাত (দৈব ) মিলনের ওড়না ঢাকা মুখের একটুখানি হাসির ঝিলিকের স্মৃতি এবং শেষ সপ্তকের উনত্রিশ সংখ্যক কবিতায় বিবাহের 'অনেক কালের একটি মাত্র দিনের' স্মৃতির সঙ্গে ধূপছায়া রঙের বেনারসী সাড়ী পরিহিতা, খোপাটি ছাড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া দন্ডায়মানা বালিকা বধূর আগমনের সঙ্গে উতসবের সানাই-এর বসন্ত পঞ্চম রাগের স্মৃতি কাব্যে লিখে গেছেন। কবির এই টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোকেই একত্রিত করলেই কবির বিবাহের সুন্দর ছবি আপনিই ফুটে ওঠে। কবির কথায় - 'বিবাহের প্রথম বতসরে /দিকে দিগন্তরে /সহানায় বেজেছিল বাঁশি /উঠেছিল কল্লোলিত হাসি। '
এরপরে নিজেরই বাড়িতে পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে এলেন অন্দরমহলে স্ত্রী আচারের সরঞ্জাম যেখানে সাজানো। বরসজ্জার শাল খানি গায়ে জড়ানো রবীন্দ্রনাথ এসে দাঁড়ালেন পিড়ির উপর। নতুন কাকিমার আত্মীয়া -যাঁকে সবাই ডাকতেন 'বড় গাঙ্গুলীর স্ত্রী ' বলে -রবীন্দ্রনাথকে বরণ করলেন তিনি। তাঁর পরনে ছিল একখানি কালো রঙের বেনারসী জরির ডুরে। বিয়ের সময় কাকিমা ছিলেন খুব রোগা। গ্রামের বালিকা ,শহুরে হাবভাব কিছুই জানতেন না। কনে এনে সাতপাক ঘোরানো হলো -শেষে বরকনে দালানে চললেন সম্প্রদান স্থলে। বাড়ির অবিবাহিত মেয়েরাও সঙ্গে সঙ্গে চলল। আমিও জুটে গেলুম তাদের সঙ্গে। দালানের একধারে বসবার জায়গা ছিল আমাদের। দেখলুম সেখানে বসে সচক্ষে কাকিমার সম্প্রদান।
রবীন্দ্রনাথের জীবনের এই বিরল মুহুর্তে উপস্থিত থাকতে পেরে আনন্দ উচ্ছ্বাসের অন্ত ছিল না অবনীন্দ্রনাথের। আবেগাপ্লুত কন্ঠে রানী চন্দকে বলেছিলেন, ' সে মূর্তি তোমরা আর দেখতে পারবে না, বুঝতে পারবে না বললে -এই আমরাই যা দেখে নিয়েছি।'
সম্প্রদানের পরে বরকনে এসে বাসরে বসলেন। রবীন্দ্রনাথের বউ এলে তাঁর থাকবার জন্যে একটি ঘর নির্দিষ্ট করা ছিল আগে থেকেই। বাসর বসলো সেই ঘরেই।বাসরঘরের সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায় প্রত্যক্ষদর্শী হেমলতা দেবীর লেখায়: 'বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টুমি আরম্ভ করলেন। ভাঁড় কুলো খেলা আরম্ভ হল। ভাঁড়ের চালগুলি ঢালাই -ভরাই হলো ভাঁড় খেলা। রবীন্দ্রনাথ ভাঁড় খেলার বদলে ভাঁড় গুলো উপুর করে দিতে লাগলো ধরে ধরে। তাঁর ছোট কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী বলে উঠলেন, 'ওকি করিস রবি? এই বুঝি তোর্ ভাঁড় খেলা? ভাঁড় গুলো সব উল্টে দিচ্ছিস কেন ?' রবীন্দ্রনাথের নিজের বাড়ি নিজেই বর। তাঁকে শশুরবাড়ি যেতে হয় নি তাই তাঁর লজ্জা সংকোচের কারণ ছিল না. রবীন্দ্রনাথ বললেন, ' জানো না কাকিমা সব যে উলট পালট হয়ে যাচ্ছে-কাজে কাজেই আমি ভাঁড় গুলো উলটে দিচ্ছি।' রবীন্দ্রনাথ বাক সিদ্ধ মানুষ ,কথায় তাঁকে হারাতে পারবে না কেউ।
এবারে বাসরে গান গাইবার পালা। কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী বরবেশী রবীন্দ্রনাথকে বললেন -"তুই একটা গান কর। তোর বাসরে আর কে গাইবে, তুই এমন গাইয়ে থাকতে ? রবীন্দ্রনাথের কন্ঠস্বর তখন কি চমতকার ছিল,সে যারা না শুনেছে বুঝতে পারবে না। আমরা যে কানে শুনেছি সে আমাদের কম সৌভাগ্য নয়। এখন সবই হারিয়ে গেছে,তবু যা পেয়েছি তাই রেখেছি মনে ধরে। বাসরে গান জুড়ে দিলেন -
আ- মরি লাবণ্যময়ী
কে ও স্থির সৌদামিনী ,
পূর্ণিমা -জোছনা দিয়ে
মার্জিত বদনখানি।
নেহারিয়া রূপ হায়,
আঁখি না ফিরিতে চায় ,
অপ্সরা কি বিদ্যাধরী
কে রূপসী নাহি জানি।
এই গানটি রবীন্দ্রনাথের ন'দি স্বর্ণকুমারী দেবীর রচনা-'বসন্ত উতসব'-এর দ্বিতীয় অঙ্কের গান ।
দুষ্টুমি করে গাইতে লাগলেন কাকিমার দিকে তাকিয়ে। বেচারী কাকিমা (মৃণালিনী দেবী) রবীন্দ্রনাথের কান্ড দেখে জড়োসড়। ওড়নায় মুখ ঢেকে মাথা হেঁট করে বসে আছেন। আরও একটা গান গেয়েছিলেন -সেটা আমার স্মরণে নেই। '
বিবাহ বাসরে ওড়না ঢাকা একটুখানি হাসির স্মৃতি সানাই-এর 'হঠাত মিলনে' ধরে রেখেছেন কবি- 'আঁচল আড়ে দীপের মতো একটুখানি হাসি ,/ নিবিড় সুখের বেদন দেহে উঠছিল নিশ্বাসি। '
বিবাহের পরে নববধূ ভবতারিণীর নাম পরিবর্তন করে মৃণালিনী রাখা হয়। এই নতুন নাম দেওয়ার পিছনে অনেকগুলি মত পাওয়া যায়। একটিতে মৃণালিনী নামটি কবির প্রথম প্রিয়া কৈশরিকা (বীথিকা) নলিনীর নামানুসারে (আন্না তড়খড়) রাখা হয়েছে। ছেলেবেলা কথিকাতে কবি লিখেছেন যে মৃণালিনী নামটি তিনি নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়েই রেখেছিলেন। অন্য একটি মতানুসারে রবীন্দ্রনাথের মান্দ্রাজি পাত্রীকে নাকচ করে এবং সম্ভাব্য পাত্রী স্ব্রর্ণলতাকে দেখে খুসি হয়ে রবীন্দ্রনাথের বড় দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'যৌতুক কি কৌতুক ' কাব্যে 'অনিন্দিতা স্বর্ণ-মৃণালিনী হোক ' বলে যে আশীর্বাদ উচ্চারণ করেছিলেন ,তারই সূত্রে এই নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল।
রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় থেকে অনেকেই রবীন্দ্রনাথের পাত্রী নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মনে কোন সংশয় ছিল না। তিনি আনন্দের সঙ্গেই তাঁর গ্রাম্য বালিকা বধূকে প্রথম দর্শনেই গান দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন- 'দাঁড়ায়েছ সংগীতের শতদল দলে।' (স্মরণ)
বস্তুত বিবাহকালে বাংলাদেশের তরুণ এবং প্রতিভাবান এবং স্বনামধন্য ঘরের রূপবান সাহিত্যিকের যথার্থ দোসর বা সহধর্মিণী হবার মতো যোগ্যতা অত্যন্ত সাধারণ ঘরের গ্রাম্য মেয়ে ভবতারিণী দেবীর যে ছিল না তা অবশ্য স্বীকার্য। কিন্তু বিবাহের অনতিকাল পরেই রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য সহৃদয় অভিভাবকত্বে তিনি কবি প্রেযসীরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
স্বর্ণলতা এঁদেরই কন্যা। অত্যন্ত রূপসী স্বর্ণলতা বেথুন স্কুলে পড়তেন ও পরবর্তীকালে লেখিকা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকেই প্রথম মহিলা সাংবাদিকের মর্যাদা দেওয়া হয়। ষোলো বছর ধরে তিনি এসোসিয়েটেড প্রেসে সংবাদ সরবরাহ করেন। ঠাকুরবাড়ির উতসবে তিনি পিতা গুণাভিরামের বরুয়ার সঙ্গে এসেছিলেন এবং তখনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বিবাহ-সম্বন্ধ হয়। এই প্রস্তাবে কবির অনুমোদন ছিল , হয়ত সেই সম্ভাবনাতেই দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথ খুশি হয়ে কবিতায় লিখেছিলেন ' অনিন্দিতা স্বর্ণ- মৃণালিনী হোক সুবর্ণ তুলির তব পুরস্কার। 'কিন্তু অনুসন্ধানের পরে মহর্ষি যখন শুনলেন , স্বর্ণলতা বিধবার সন্তান তখন সম্বন্ধ ভেঙে যায়।
স্বর্ণলতার সঙ্গে কবির বিবাহ প্রস্তাবটির কথা কেউ কখনও বলেননি, সম্ভবত কবি নিজে তা সংগোপনে রেখেছিলেন বলে। পরে শুধু জ্জানদাভিরাম ও তাঁর মেয়ে ইরার সঙ্গে এ নিয়ে কৌতুকের সুরে কথা বলতে শোনা গিয়েছে। যে সময়ে তিনি ইরাকে তার পিসির কথা তুলে ঠাট্টা করেছেন ,মনে রাখতে হবে ,তখন স্বর্ণলতাও আর ইহলোকে নেই. তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৩২ সালে। জ্জানদাভিরাম তাঁর দিদিকে খুব ভালবাসতেন ,তাই সেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ের সঙ্গে যখন তাঁর বিয়ে হল ,তখন দিদির বিয়ে না হওয়ার কথাটি বিশেষ করে মনে পড়েছিল। আসলে ঠাকুরবাড়িতে মহর্ষি বিধবা বিবাহের বিপক্ষে থাকায় জ্জানদাভিরামের সঙ্গে লতিকার বিয়ে হয় মহর্ষির মৃত্যুর পরে। স্বর্ণলতার আগ্রহেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ে লতিকা বরুয়া পরিবারে বধূ হয়ে আসেন।
পূর্বোল্লিখিত দুইটি পাত্রী দেখার সম্ভাবনা নাকচ হবার পরে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ নিয়ে তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল।তখন বাড়ির অভিভাবকেরা এই বঙ্গের উপযুক্ত জায়গা থেকে পাত্রী দেখার সিদ্ধান্ত নেন। অবনীন্দ্রনাথের ঘরোয়া বইটিতে তাঁর স্মৃতিকথায় তিনি লেখেন, 'রবিকাকার বিয়ে আর হয় না; সবাই বলেন,বিয়ে করো -বিয়ে করো এবারে, রবিকাকা রাজি হন না, চুপ করে ঘাড় হেঁট করে থাকেন। শেষে তাঁকে তো সবাই মাইল বুঝিয়ে রাজি করালেন। ' এ ব্যাপারে মহর্ষির নিশ্চয়ই কিছু চাপ ছিল এবং সেজন্যে তিনি সেপ্টেম্বর মাসে কবিকে মুসৌরিতে ডেকে পাঠান। রবীন্দ্রনাথ মুসৌরিতে যাবার কিছুদিন পরেই তাঁর বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয় এবং সেরেস্তার কর্মচারী অভয় চরণ ঘোষকে যশোরে পাঠানোর সংবাদ পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে তেমন কোনো খোঁজ খবর না পাওয়াতে রবীন্দ্রনাথের বৌদিরা দলবেধে মেয়ে দেখতে যান যশোর খুলনাতে।
এই মেয়ে দেখার দলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কি না, সেই বিষয় নিয়ে মতান্তর আছে. রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন তিনি কনে দেখতে যান নি ,কিন্তু ইন্দিরা দেবী চৌধারিণী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন কনে দেখার দলে তাঁর 'রবিকাকা' -ও ছিলেন। অবশ্য দু'জনেই তাঁদের শেষ জীবনে স্মৃতিচারণ করেছেন-কারো একজনের বিভ্রম ঘটা অস্বাভাবিক নয়। কবির বৌঠানেরা অর্থাত জ্জানদানন্দিনী দেবী, কাদম্বরী দেবী , জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, বালক সুরেন্দ্রনাথ ও বালিকা ইন্দিরা ও সঙ্গে একুশ বাইশ বছরের নব যৌবনের কবিকে নিয়ে পাত্রীর সন্ধানে জ্জানদানন্দিনী দেবীর বাপের বাড়ি নরেন্দ্রপুর গ্রামে আশ্রয় নেন। ইন্দিরা দেবীর মামার বাড়ি মাটির বাড়ি, খড়ের চাল, উঁচু রোযাক। মাটির আঙিনা। আশেপাশে বাগান-পুকুর।
এখানেই বালিকা ইন্দিরা তাঁর জ্যোতিকাকা ও রবি কাকার কাছে ঘড়ি-দেখা শিখলেন। মা-কাকীরা পাত্রী খুঁজতে এ-পাড়া ও-পাড়া যান, আর দুই কাকা বাড়িতে শিশুদের সঙ্গ দেন. প্রায়ই তাঁরা রবীন্দ্রনাথের জন্যে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কনে দেখতে গেলেও ,তাঁদের পছন্দমত একটি সুন্দরী পাত্রীও খুঁজে পেলেন না। যশোরে পিরালী ব্রাহ্মণদের একটা আড্ডা ছিল,তাই জোড়া সাঁকোর বৌয়েরা অধিকাংশ সেখান থেকেই আসতো। তাদের সুন্দরী বলে একটা নাম ছিল. কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় নির্বাচক মন্ডলীর কাছে কোনো সুন্দরী নজরে পড়ল না। দক্ষিণ ডিহি ,চেঙট প্রভৃতি সব পাড়া খুঁজেও মনের মত মেয়ে পেলেন না। অবশেষে খুলনা জেলার দক্ষিণে ডিহি ফুলতলা গ্রামের বেনীমাধব রায়্চৌধুরীর একমাত্র কন্যা ফুলি ওরফে ভবতারিণী কে মনোনীত করা হলো।
শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ নিজেও পাত্রীকে মনোনীত করেছিলেন। তবে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল মন্তব্য করেছিলেন, ' রবীন্দ্রনাথ স্বেচ্ছায় একটি দশ বছরের কম প্রায় অশিক্ষিতা মেয়েকে ভাবী জীবনসঙ্গিনী মনোনীত করবেন একথা বিশ্বাস করা কঠিন।' ভবতারিণীর গাত্রবর্ণ শ্যামলা ছিল এবং তাঁকে সুন্দরী বলা চলে না। কবি কনের এই শ্যামলা রংটিকেই পছন্দ করেছিলেন। পরে কবিতায় সেই ভাব প্রকাশ করেছিলেন এই ভাবে, 'যে দেখায় সে আমার মন ভুলিয়েছে / তাতে আছে যেন এই মাটির শ্যামল অঞ্জন ,/ ওর কচি ধানের চিকণ আভা। ' বিবাহের সময় ভবতারিণীর বয়স ছিল নয় বছর নয় মাস, জন্মতারিখ ১লা মার্চ,১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ। কবি কনের পিতৃগৃহের পরিচয় অথবা কনে দেখার বিবরণ কাউকেই বলেননি ,কিন্তু পরিহাসছলে বলে গেছেন শাশুরির ১০৮ পদ রান্নার কাহিনীটি। আর কাব্যে উপন্যাসে কনের পিতৃ গৃহের পরিচয় ও গ্রাম্য পথের বিবরণ লিখে গেছেন। 'ধরাতলে দীনতম ঘরে/ যদি জন্মে প্রেয়সী আমার ,নদীতীরে / কোন -এক গ্রাম্ প্রান্তে প্রচ্ছন্ন কুটিরে / অশ্বত্থ ছায়ায় ,সে বালিকাবক্ষে তার / রাখিবে সঞ্চয় করি সুধার ভান্ডার / আমারি লাগিয়া সযতনে। ' অর্থাত ফুলতলি গ্রামের প্রান্তদেশে নদীর ধারে অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় যে কুটির রয়েছে ,সেই দীনতম ঘরের বালিকাকেই কবি দেখতে গিয়েছিলেন।
ইন্দিরা দেবী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে যশুরে মেয়েদের মধ্যে সাধারণ গুণের ও তাঁদের মিশুকে ও পরকে আপন করার ক্ষমতা ভবতারিনীর মধ্যে পূর্ণভাবে প্রকাশিত হতে দেখেছিলেন। আর তাঁর রবিকাকার এই অসম বিবাহের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, 'রবিকাকার মত অমন গুণবান ,রূপবান ,ভাগ্যবান, ধনবান, খ্যাতিমান (ভবিষ্যতের মত না হলেও যথেষ্ট ) যুবাপুরুষ , গুরুজনেরা যে মেয়েকে হাতে তুলে দিলেন , বিনা বাক্যব্যয়ে নির্বিবাদে কী করে তাকেই বিয়ে করতে রাজি হলেন ও পরে সুখে স্বচ্ছন্দে ঘর করতে লাগলেন, ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। অথচ আজকাল কত কথা শোনা যায় যে ,স্ত্রী শিক্ষিতা নাহলে শিক্ষিত স্বামীর সঙ্গে মিশ খাবে কী করে ইত্যাদি। সেকালে ওঁদের স্ত্রীরা সে হিসাবে কে-ই বা স্বামীর উপযুক্ত ছিলেন ? অথচ ওঁরা সর্বদা তাঁদের যথেষ্ট মেনে চলতেন, গৃহলক্ষীর সম্মান দিতেন।'
কনে দেখার পালা সঙ্গ করে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রী কাদম্বরী দেবী , দিদি সৌদামিনী , জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মস্থল বম্বের কারোয়ারে যান। কারোয়ার থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ,কাদম্বরী দেবী ও রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতায় ফিরে আসার পরেই রবীন্দ্রনাথের বিবাহের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। এরই ফলশ্রুতি স্বরূপ ১৮৮৩ খ্রীস্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর বিবাহের দিন ধার্য হয়। তবে এই বিবাহে জ্জানদানন্দিনী দেবী ও সৌদামিনী দেবী কারয়ারে থেকে যাওয়ায় বিবাহে অনুপস্থিত ছিলেন। ঠিক এই সময়ে আকস্মিক সৌদামিনী দেবীর স্বামী শ্রী সরদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়ে বিবাহ বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। অন্যদিকে প্রথমে উতসাহ ও উদ্দেপনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অতি প্রিয় নতুন বৌঠান পাত্রী দেখতে গেলেও , কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বিবাহ সমারোহে যোগ দেন নি। এই সব কারণে কবি নিজেকে অনাদৃত বলে উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় অত্যন্ত সাধারণ ভাবে। কোনো জাঁকজমক হয় নি।
অথচ রবীন্দ্রনাথ শৈশব থেকেই এই বিশেষ দিনটির স্বপ্ন দেখতেন। কারণ শৈশবে কৈলাশ মুকুজ্জের সালঙ্কারা বধূর বিবাহের উতসবের বর্ণনা বালক বয়সে শুনেই সেটিকেই যুবক রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ের গোপন লালন করে এসেছিলেন। তাই তাঁর বিবাহ জাঁক -জমকের সঙ্গে হয়নি বলে চিরকাল কবির মনে আক্ষেপ ছিল। সেই আক্ষেপ মাঝে মাঝে আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রকাশ করতেন। সেজন্যে মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীকে বিয়ের ব্যাপারে বলেছিলেন, 'আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই। --- নিজের বিয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই, সে কথা উত্থাপণ মাত্র হেসে উড়িয়ে দেবে ,অথচ পরের বিয়ের পদ্য লেখ।' কবির মনের এই গোপন আকাঙ্খা তাঁর আকাশ প্রদীপ কাব্যের 'বধূ' কবিতায় সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন।তবে কবির ইচ্ছামত পাত্রী ভবতারিণীকে জোড়া সাঁকোতে সুসজ্জিত করে এনে বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়।
তবুও আনন্দের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নিজের বিবাহের এক অভিনব নিমন্ত্রণপত্র নিজের হাতে লিখে প্রিয় বন্ধু প্রিয়নাথ সেন ও অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবকে পাঠিয়েছিলেন। এই পত্রটির মাথায় ভোরের পাখির প্রথম আবির্ভাবের সঙ্গে সূর্যোদয়ের ছবির নীচে মধুসূদন দত্তের কবিতা 'আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হয়' -লিখে তারই পাশে লিখলেন ' আমার Motto নহে। '
প্রিয় বাবু,
আগামী রবিবার ২৪ অগ্রহায়ণ তারিখে শুভদিনে শুভলগ্নে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ বিবাহ হইবেক। আপনি তদুপলক্ষে বৈকালে উক্ত দিবসে ৬নং জোড়াসাঁকোস্থ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভবনে উপস্থিত থাকিয়া বিবাহদি সন্দর্শন করিয়া আমাকে এবং আত্মীযবর্গকে বাধিত করিবেন।
ইতি
অনুগত
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটি সূত্রে জানা যায় , রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভবতারিণীর বিবাহের ঘটকালি করেন কবির মাতুল ব্রজেন্দ্রনাথ রায়ের পিসিমা আদ্যাসুন্দরী দেবী। প্রচলিত ঠাকুরবাড়ির রীতি অনুসারে রবীন্দ্রনাথের আইবুড়ো ভাত অবনীন্দ্রনাথের বাড়িতেই হয়। অবনীন্দ্রনাথের মা রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী ভবতারিণীর সম্পর্কে বোন হন ,তাই তিনি এই বিবাহে খুব খুশী হয়েছিলেন।
অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায় আছে-
'মা গায়ে হলুদের পরে রবিকাকাকে আইবুড়ো ভাতে নেমন্তন্ন করলেন।অবনীন্দ্রনাথের বড় পিসিমা কাদম্বিনী দেবীর ঘরে আইবুড়ো ভাত সাজানো হয়। মা খুব খুশি,ভবতারিণী একে যশোরের মেয়ে তায় সম্পর্কে বোন। বিরাট আয়োজন।পিসিমারা রবিকাকাকে ঘিরে বসেছেন ,এ আমাদের নিজের চোখে দেখা। রবিকাকা দৌড়দার শাল গায়ে, লাল কি সবুজ রঙের মনে নেই তবে খুব জমকালো রঙ চঙের। বুঝে দেখো, একে রবিকাকা , তায় ওই সাজ ,দেখাচ্ছে যেন দিল্লীর বাদশা! তখনই ওঁর কবি বলে খ্যাতি ,পিসিমারা জিজ্ঞাসা করছেন ,কি রে, বউ দেখেছিস ,পছন্দ হয়েছে ,কেমন হবে বউ ইত্যাদি সব। রবিকাকা ঘাড় হেঁট করে বসে একটু একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছেন,আর লজ্জায় মুখে কথাটি নেই।'
কবি নিজের বিবাহের গল্প কারো কাছে করেন নি কিন্তু কবিতায় টুকরো টুকরো ভাবে বিবাহের স্মৃতি কথা লিখে গেছেন যেমন-'ক্ষণিক মিলনের' দুইখানি দিশেহারা মেঘের বর্ণনার পিছনে রবীন্দ্র মৃণালিনীর অকস্মাত বা দৈব ঘটিত মিলন কাহিনী যা কাব্যে বহুবার হয়েছে। সানাই-এর 'হঠাত মিলন' বা অকস্মাত (দৈব ) মিলনের ওড়না ঢাকা মুখের একটুখানি হাসির ঝিলিকের স্মৃতি এবং শেষ সপ্তকের উনত্রিশ সংখ্যক কবিতায় বিবাহের 'অনেক কালের একটি মাত্র দিনের' স্মৃতির সঙ্গে ধূপছায়া রঙের বেনারসী সাড়ী পরিহিতা, খোপাটি ছাড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া দন্ডায়মানা বালিকা বধূর আগমনের সঙ্গে উতসবের সানাই-এর বসন্ত পঞ্চম রাগের স্মৃতি কাব্যে লিখে গেছেন। কবির এই টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোকেই একত্রিত করলেই কবির বিবাহের সুন্দর ছবি আপনিই ফুটে ওঠে। কবির কথায় - 'বিবাহের প্রথম বতসরে /দিকে দিগন্তরে /সহানায় বেজেছিল বাঁশি /উঠেছিল কল্লোলিত হাসি। '
এরপরে নিজেরই বাড়িতে পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে এলেন অন্দরমহলে স্ত্রী আচারের সরঞ্জাম যেখানে সাজানো। বরসজ্জার শাল খানি গায়ে জড়ানো রবীন্দ্রনাথ এসে দাঁড়ালেন পিড়ির উপর। নতুন কাকিমার আত্মীয়া -যাঁকে সবাই ডাকতেন 'বড় গাঙ্গুলীর স্ত্রী ' বলে -রবীন্দ্রনাথকে বরণ করলেন তিনি। তাঁর পরনে ছিল একখানি কালো রঙের বেনারসী জরির ডুরে। বিয়ের সময় কাকিমা ছিলেন খুব রোগা। গ্রামের বালিকা ,শহুরে হাবভাব কিছুই জানতেন না। কনে এনে সাতপাক ঘোরানো হলো -শেষে বরকনে দালানে চললেন সম্প্রদান স্থলে। বাড়ির অবিবাহিত মেয়েরাও সঙ্গে সঙ্গে চলল। আমিও জুটে গেলুম তাদের সঙ্গে। দালানের একধারে বসবার জায়গা ছিল আমাদের। দেখলুম সেখানে বসে সচক্ষে কাকিমার সম্প্রদান।
রবীন্দ্রনাথের জীবনের এই বিরল মুহুর্তে উপস্থিত থাকতে পেরে আনন্দ উচ্ছ্বাসের অন্ত ছিল না অবনীন্দ্রনাথের। আবেগাপ্লুত কন্ঠে রানী চন্দকে বলেছিলেন, ' সে মূর্তি তোমরা আর দেখতে পারবে না, বুঝতে পারবে না বললে -এই আমরাই যা দেখে নিয়েছি।'
সম্প্রদানের পরে বরকনে এসে বাসরে বসলেন। রবীন্দ্রনাথের বউ এলে তাঁর থাকবার জন্যে একটি ঘর নির্দিষ্ট করা ছিল আগে থেকেই। বাসর বসলো সেই ঘরেই।বাসরঘরের সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায় প্রত্যক্ষদর্শী হেমলতা দেবীর লেখায়: 'বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টুমি আরম্ভ করলেন। ভাঁড় কুলো খেলা আরম্ভ হল। ভাঁড়ের চালগুলি ঢালাই -ভরাই হলো ভাঁড় খেলা। রবীন্দ্রনাথ ভাঁড় খেলার বদলে ভাঁড় গুলো উপুর করে দিতে লাগলো ধরে ধরে। তাঁর ছোট কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী বলে উঠলেন, 'ওকি করিস রবি? এই বুঝি তোর্ ভাঁড় খেলা? ভাঁড় গুলো সব উল্টে দিচ্ছিস কেন ?' রবীন্দ্রনাথের নিজের বাড়ি নিজেই বর। তাঁকে শশুরবাড়ি যেতে হয় নি তাই তাঁর লজ্জা সংকোচের কারণ ছিল না. রবীন্দ্রনাথ বললেন, ' জানো না কাকিমা সব যে উলট পালট হয়ে যাচ্ছে-কাজে কাজেই আমি ভাঁড় গুলো উলটে দিচ্ছি।' রবীন্দ্রনাথ বাক সিদ্ধ মানুষ ,কথায় তাঁকে হারাতে পারবে না কেউ।
এবারে বাসরে গান গাইবার পালা। কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী বরবেশী রবীন্দ্রনাথকে বললেন -"তুই একটা গান কর। তোর বাসরে আর কে গাইবে, তুই এমন গাইয়ে থাকতে ? রবীন্দ্রনাথের কন্ঠস্বর তখন কি চমতকার ছিল,সে যারা না শুনেছে বুঝতে পারবে না। আমরা যে কানে শুনেছি সে আমাদের কম সৌভাগ্য নয়। এখন সবই হারিয়ে গেছে,তবু যা পেয়েছি তাই রেখেছি মনে ধরে। বাসরে গান জুড়ে দিলেন -
আ- মরি লাবণ্যময়ী
কে ও স্থির সৌদামিনী ,
পূর্ণিমা -জোছনা দিয়ে
মার্জিত বদনখানি।
নেহারিয়া রূপ হায়,
আঁখি না ফিরিতে চায় ,
অপ্সরা কি বিদ্যাধরী
কে রূপসী নাহি জানি।
এই গানটি রবীন্দ্রনাথের ন'দি স্বর্ণকুমারী দেবীর রচনা-'বসন্ত উতসব'-এর দ্বিতীয় অঙ্কের গান ।
দুষ্টুমি করে গাইতে লাগলেন কাকিমার দিকে তাকিয়ে। বেচারী কাকিমা (মৃণালিনী দেবী) রবীন্দ্রনাথের কান্ড দেখে জড়োসড়। ওড়নায় মুখ ঢেকে মাথা হেঁট করে বসে আছেন। আরও একটা গান গেয়েছিলেন -সেটা আমার স্মরণে নেই। '
বিবাহ বাসরে ওড়না ঢাকা একটুখানি হাসির স্মৃতি সানাই-এর 'হঠাত মিলনে' ধরে রেখেছেন কবি- 'আঁচল আড়ে দীপের মতো একটুখানি হাসি ,/ নিবিড় সুখের বেদন দেহে উঠছিল নিশ্বাসি। '
বিবাহের পরে নববধূ ভবতারিণীর নাম পরিবর্তন করে মৃণালিনী রাখা হয়। এই নতুন নাম দেওয়ার পিছনে অনেকগুলি মত পাওয়া যায়। একটিতে মৃণালিনী নামটি কবির প্রথম প্রিয়া কৈশরিকা (বীথিকা) নলিনীর নামানুসারে (আন্না তড়খড়) রাখা হয়েছে। ছেলেবেলা কথিকাতে কবি লিখেছেন যে মৃণালিনী নামটি তিনি নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়েই রেখেছিলেন। অন্য একটি মতানুসারে রবীন্দ্রনাথের মান্দ্রাজি পাত্রীকে নাকচ করে এবং সম্ভাব্য পাত্রী স্ব্রর্ণলতাকে দেখে খুসি হয়ে রবীন্দ্রনাথের বড় দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'যৌতুক কি কৌতুক ' কাব্যে 'অনিন্দিতা স্বর্ণ-মৃণালিনী হোক ' বলে যে আশীর্বাদ উচ্চারণ করেছিলেন ,তারই সূত্রে এই নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল।
রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় থেকে অনেকেই রবীন্দ্রনাথের পাত্রী নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মনে কোন সংশয় ছিল না। তিনি আনন্দের সঙ্গেই তাঁর গ্রাম্য বালিকা বধূকে প্রথম দর্শনেই গান দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন- 'দাঁড়ায়েছ সংগীতের শতদল দলে।' (স্মরণ)
বস্তুত বিবাহকালে বাংলাদেশের তরুণ এবং প্রতিভাবান এবং স্বনামধন্য ঘরের রূপবান সাহিত্যিকের যথার্থ দোসর বা সহধর্মিণী হবার মতো যোগ্যতা অত্যন্ত সাধারণ ঘরের গ্রাম্য মেয়ে ভবতারিণী দেবীর যে ছিল না তা অবশ্য স্বীকার্য। কিন্তু বিবাহের অনতিকাল পরেই রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য সহৃদয় অভিভাবকত্বে তিনি কবি প্রেযসীরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
Beshi tai ajana. Rabindranath er sahityo karme ektumatro unki jhunki merechhi. Kintu tar baire r anek tai janina.Lekhak er bahu jatne saras paribeshona amader samridhdha korechhe. Erakam aro lekha chai.
ReplyDeleteSatya,
DeleteAashaa kori bhaalo aachho. Tomaar je lekhaati pore bhaalo legechhe taate aami khub khushi hoyechhe. Ei byaapaare porobortee lekhaa likhte seti aamaake onupreronaa jaagiyechhe. Porer porbo lekha hoye gechhe. Tumi ektu sustho holei pathiye debo.