Saturday, July 26, 2014

আমেরিকার আর্কেডিয়া শহরের আর্বরেটাম ও ময়ূরমহল


আমার ছোট ছেলে ২০০৯ সালে আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের লস এঞ্জেলস কাউন্টির অন্তর্গত একটি ছোট শহর আর্কেডিয়াতে  নিজ বাসগৃহ কিনে চলে এসেছিল ওরা আগে এরই পাশের শহর প্রাচীন শহর পাসাদেনা তে  একটি এপার্টমেনটে  থাকত। আমরা দুজনে ওখানে ২০০১ সালে গিয়ে খুবই আমোদ প্রমোদ করে এসেছিলাম। এই আর্কেডিয়াতে  আছে একটি সুন্দর মনোরম আর্বরেটাম।  আর্বরেটামের অর্থ হলো বিশাল আয়তনের বোটানিক্যাল গার্ডেন যেখানে বিভিন্ন ধরনের নানা দেশের সুদৃশ্য  ও  বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। ২০০৬ সালে ওদের মেয়ে অবন্তী জন্মানোর পরে   একটু বড় হলে ছেলে পুত্রবধূ কন্যাকে নিয়ে পাসাদেনা থেকে এই আর্কেডিয়ার আর্বরেটাম দেখাতে নিয়ে এসেছিল। সেটা নিছক বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখাতে নয় ,বরং এর বিশেষ আকর্ষণ ময়ূরের ঝাঁকের অবাধ ঘোরাফেরা দেখানোর জন্যে। খুব কাছে থেকে সেই ময়ূরের ঝাঁকের ঘোরাফেরার দৃশ্য ছবিতে দেখে খুব ভালো লেগেছিল এবং সুযোগ পেলে এগুলিকে দেখবার প্রচন্ড কৌতূহল ছিল   

           

দীর্ঘ নয় বছর বাদে  ২০১০ সালে  ছেলের নতুন শহর আর্কেডিয়াতে  ছেলে ,বৌমা ও নাতনীর কাছে গিয়েছিলাম  তখন ওদের বাড়িঘর দেখার পরেই একদিন পুত্রবধূ পিউ আমাদের সেই আর্বরেটাম  ও  ময়ূর মহল দেখাতে  নিয়ে গিয়েছিল।    এই আর্বরেটাম এবং ময়ূর্ মহল ওদের বাড়ির খুব কাছেই। ওখানে যাওয়ার আগে যখনি ওই পথ ধরে সোজা সামনের হাই ওয়েতে গিয়েছি তখনি বাঁদিকে  একটি ফোয়ারা থেকে অবিরত জল পড়তে দেখেছিলাম। পিউকে ওটির কথা জিজ্জাসা করাতেই ও বলেছিল যে ওটাই বিখ্যাত আর্বরেটামের প্রবেশ পথ।  ২১শে  জুলাই পুত্রবধূর সাথে আমি,গিন্নী এবং আমাদের অতি আদরের নাতনি অবন্তী  আর্বরেটাম  দেখতে বেরিয়ে পরলাম। ওদের বাড়ির প্রধান সড়ক ফেযার ভিউ এভেনিউ ধরে সোজা গিয়ে আমরা ডানদিকে বল্ডউইন এভেনিয়ু  ধরে উত্তর দিকে একটু গিয়েই সেই  অভীপ্সিত স্থানে পৌঁছে গেলাম। উত্তর বল্ডউইন এভেনিউয়ের উপর অবস্থিত এই আর্বরেটামের বিপরীতেই রয়েছে স্যান্টা এনিটা রেস ট্র্যাক ও বিশাল শপিং মল।  আর্বারটামের প্রবেশ পথে সদা লাস্যময়ী ফোয়ারা পর্যটকদের সর্বদাই স্বাগত জানাচ্ছে। পার্কিং স্পেসে গাড়ি রেখে পুত্রবধূর সাথে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। পার্কিং লট থেকে নামতেই চারদিকের শ্যামল সবুজ গাছ গাছালির ইশারা এখানের বিরাট আকর্ষণ।  ক্যামেরা হাতে আমি সব সময়ে উদগ্রীব।  রিসেপসন সেন্টারে ঢোকবার মুখেই বিশাল ক্যানা  ফুলের ঝাড়ের সামনে  ওদের ছবি তুলতে দেরী করলাম না।  ক্লিক ক্লিক ক্লিক! 
এবারে  সবাই  রিসেপসন সেন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম। সুদৃশ্য প্রবেশদ্বারের ভিতর দিয়ে ভিতরে ঢুকে ওখানের সুন্দর সাজানো গোছানো পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হলাম। দেশের কলকাতার বি বা দী বাগের সরকারী পর্যটন দপ্তরের ঘিঞ্জি অন্ধকার পরিবেশের কথা খুব মনে পড়ছিল। পিউ রিসেপসন কাউন্টারে কর্মরতা মহিলার সাথে কথাবার্তা বলে গেল আর আমি নাতনিকে নিয়ে ভিতরের সুদৃশ্য ছবিগুলো  দেখতে লাগলাম। দেওয়ালে আর্বরেটামের বিশাল মানচিত্র যাতে পুরো গার্ডেনের বিভিন্ন স্থানের বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। যারা হেঁটে দেখতে চান তাদের জন্যে বিভিন্ন জায়গা দিয়ে পার্কের ভিতরের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া রয়েছে। কি কি করনীয় এবং কি কি করা নিষেধ তার স্পষ্ট নির্দেশিকাও সেখানে ছিল।  এ ছাড়া  অন্যত্র এই পার্কের ভিতরের বিভিন্ন জায়গার নানা প্রজাতির নানা বর্ণের গাছ গাছালি , ফুল ,ক্যাকটাস ও অর্কিডের ছবি সুন্দর ভাবে দৃশ্যমান ছিল।  পিউ ইতিমধ্যে আমাদের জন্যে পার্কে ঢোকার টিকিট কেটে ফেললো। বড়দের টিকিট আট ডলার, ছোটদের কোনো টিকিট লাগে না।  পিউ বার্ষিক সদস্য হওয়াতে তার কোনো টিকিট লাগলো না।  যেহেতু এই বিশাল আয়তনের ১২৭ একরের পার্কে আমাদের তখনকার শারীরিক অবস্থায় হেঁটে ঘোরা সম্ভব নয় তাই আমাদের জন্যে ওখানের দুই কামরার ট্রামে ঘোরার ব্যবস্থা র জন্যে জনা প্রতি চার ডলারের টিকিট কেটে নেওয়া হলো।  বেলা এগারটা থেকে বিকেল তিনটে পর্যন্ত এক ঘন্টা অন্তর অন্তর এই ট্রামে করে পুরো পার্ক ঘোরানো হয়।  ধীর গতির এই ট্রাম পরিভ্রমণে প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগে। বেলা বারোটার ট্রিপ  নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।  

হাতে কিছুক্ষণ সময় থাকাতে ট্রাম ছাড়ার জায়গার আশেপাশে একটু ঘুরতে গেলাম। তখনি ঘটল সেই আশ্চর্য ঘটনা। আমাদের মাথার উপর দিয়ে সামনেই পাখা ছড়িয়ে নামল একটি বিশাল ময়ূর। এত সামনে থেকে এত বড় ময়ূর এত স্বাধীন ভাবে দেখাটা সত্যি বিস্ময়কর। আমার নাতনি অবন্তী তো আনন্দে  হাততালি দিতে দিতে তার পিছনে  ছুট দিল।  আমরাও তাঁর পিছনে পা চালালাম। 

অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা একটি বিশাল মাঠের সামনে এসে দাঁড়ালাম। ওখানে চারপাশে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের এবং অন্যান রকমের গাছ পালা নজরে এলো।  চারিদিক বেশ পরিষ্কার  পরিচ্ছন্ন। সামনেই একটি সুদৃশ্য কফিবার। সামনের ঢাকা দেওয়া চত্বরে  অনেকেই বসে কফির কাপে চুমুক দিয়ে আয়েশ করছেন।  ওখানেই একপাশে আমাদের দুই কামরার ট্রাম গাড়ি দেখলাম। ওখানেই দাঁড়িয়ে আমাদের সফরের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম।  

এই সময়ে চারিদিক থেকে ময়ূরের সম্মিলিত কেকাধ্বনী শুনতে পেলাম। এই আওয়াজের কথা বইতে পড়েছি ,কিন্তু এত সামনে থেকে এত স্পষ্টভাবে এই আওয়াজ শোনার এই অভিজ্ঞতা এই প্রথম। ধ্বনিটি মধুর না হলেও বিচিত্র অনুভূতি হলো।  কেকা ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক থেকে ময়ূরের ঝাঁক নেমে আসতে লাগলো। মাঠের চার দিকে, কফি শপের চারধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘোরাঘুরি করতে   লাগলো। চারপাশের অগনিত লোকজন দেখে এদের কোনো ভয়ডর নেই। এখানের দর্শকেরা খুবই ভদ্র, এরা এদের কোনো রকম বিরক্তি উত্পাদন করে না।  শুধু আমার নাতনি সমেত ছোট ছোট বাচ্চারা এদের পিছন পিছন ঘুরতে লাগলো। সবাইয়ের সঙ্গে আমিও নাতনির পিছন পিছন ক্যামেরা বাগিয়ে ময়ূরদের ঝাঁকে মিশে গেলাম। এ এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা। এর পরে এই বাগানে ঘোরার সময় বিবিধ গাছপালা ও নানা রঙের পুষ্পরাজি দেখে মুগ্ধ হয়েছি। অনেক ছবি তুলেছি।  তবে এই ময়ূর মহলের স্মৃতি কোনদিন ভুলতে পারি নি।  

শুনলাম ১৮৭৫ সালে এই আর্বরেটামের মালিকানা  ইলিয়াস লাকি বল্ড উইন কিনে নেবার পরে ভারতের রাজস্থান থেকে একজোড়া ময়ূর কিনে এখানে নিয়ে আসেন। আজকে সেই ময়ূরের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। এই বোটানিক্যাল গার্ডেনের মূল আকর্ষণ এই ময়ূরের ঝাঁক। এখানে ময়ূরেরা অবাধে বিচরণ করে।  এরা বাচ্চাদের পক্ষে খুবই সুরক্ষিত। যেহেতু এইসব ময়ূরদের কেউ বিরক্ত করে না, সেজন্যে এই ময়ূরের দল  অবাধে সবার সাথে একাত্ম হয়ে যত্র তত্র ঘুরে বেড়ায়।  পুরুষ ময়ূরদের পাখনার রং বিচিত্র ও খুবই সুন্দর। শোনা গেল যে সঙ্গম কালে পুরুষ ময়ূরেরা তাদের সঙ্গিনীদের তাদের উজ্জ্বল ও বিচিত্র রংয়ের পেখম নাচিয়ে আকর্ষণ করে।  তবে দু:খের বিষয় ,আমাদের স্বল্পকালীন অবস্থানকালে পুরুষ ময়ূরদের পেখম তুলে ঘুরে বেড়াতে দেখি নি।  ময়ূরদের সেই বিখ্যাত কেকাধ্বনী আগে বইতে পড়া থাকলেও এখানেই সর্বপ্রথম স্বকর্ণে শুনতে পেলাম। এই রাস্তা দিয়ে গাড়িতে করে বহুবার অতিক্রম করার সময়েও মাঝে মাঝে এই আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। এখানের সামাজিক জীবনের উপর ময়ূরদের বিশাল প্রভাব পড়েছে। সেজন্যে আর্কেডিয়ার সরকারী প্রতীক ময়ূর। 
     সকাল বারোটা  বাজার একটু আগেই আমরা সফরের জন্যে নির্দিষ্ট ট্রাম গাড়িতে নিজেদের টিকিট দেখিয়ে উঠে পড়লাম।  সামনের কামরাতে আমরা আয়েশ করে বসলাম। পিছনে একটি চীনা পরিবার ছিল।  পিছনের কামরাতে আরও কয়েকটি পরিবার বসেছিল। ট্রাম ধীর গতিতে এগিয়ে চলল।  চালক আগে থেকেই মাইক্রফোনে এখানের বিভিন্ন গাছ গাছালির বর্ণনা দিচ্ছিলেন। গাড়ি যাওয়ার পথ আর্বরেটামের একদিক  দিয়ে গিয়ে চক্রাকারে অন্য দিক দিয়ে ঘুরে এসেছে। 

এই বোটানিক্যাল গার্ডেন বিশ্বের বিশ্বের নানা প্রান্তের বিভিন্ন নামী দামী প্রজাতির গাছের জন্যে বিখ্যাত।  মূলত ভৌগলিক অঞ্চলের বিচারে প্রায় পাঁচ হাজার বিভিন্ন গাছ গাছালি দিয়ে এই আর্বরেটাম সুসজ্জিত। এই অঞ্চলগুলি হলো আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চল ,দক্ষিণ পশ্চিম ইউরোপ, দক্ষিন ও উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়া। এ ছাড়া এখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নানা ইউক্যালিপ্টাস  গাছের সমাবেশ আছে।  
ট্রাম চলতে আরম্ভ করলে নিমেষের মধ্যে পট  পরিবর্তন  হতে শুরু করলো। ট্রামের এক পাশে বসে দুদিকের গাছ গাছালির দিকে নজর রাখা এবং ওই গতির মধ্যে ক্যামেরাতে তাক করে ছবি তোলা  খুবই দুরূহ ব্যাপার। প্রথমেই  নানা আকারের ও নানা ধরনের ক্যাকটাস ও সাকুলেনটের  সুসজ্জিত সারি দেখা গেল চারিদিকে। এগুলো বেশ পরিকল্পনামাফিক লাগানো হয়েছে বলে মনে হলো।  





   বিভিন্ন রকমের বিশাল আয়তনের ও বিস্তৃত আকারের গাছ দেখা যাচ্ছিল দুই ধার ধরে. কোনটা ফেলে কোনটা দেখব   বুঝে উঠতে পারছিলাম না।  পার্কের মধ্যে অনেক দর্শককে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছিল। এই বিশাল বাগানের মধ্যে হারিয়ে যাবার কোনো ভয় নেই।  অনেক জায়গাতেই বাগানের লোকেশন ম্যাপ দেওয়া রয়েছে।  সেখানে বাগানের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের নির্দেশ দেওয়া রয়েছে।  ওই ম্যাপ দেখে দর্শকেরা নিজেরাই এই বাগান সহজেই দেখে নিতে পারেন। তবে যেটা সবচেয়ে নজর কাড়লো  সেটা এখানের নিপুণ তত্ত্বাবধানের ছাপ।  কোথাও অনাবশ্যক আবর্জনা জমে নেই এই বিশাল আয়তনের পার্কে। 





অনেক গাছের তলায় ময়ূর ও ময়ূরীরা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এটা এদের অভয়ারণ্য বলা চলে।  এখানে অনেক জলাশয় রয়েছে। এরকম এক বিশাল লেকের পাশ দিয়ে আমাদের ট্রাম চলছিল। জলের মধ্যে পাথরের উপর নানা প্রজাতির হাঁসেদের দেখতে পেলাম। ওখানে ট্রাম একটু থামলে কাছে গিয়ে ভালোভাবে ছবি তুলতে পারতাম, কিন্তু সে সুযোগ হলো না।  এই বল্ডউইন  লেকের একপাশে সুদৃশ্য গম্বুজাকৃতি এনের কটেজ দেখতে পেলাম। এটি  নাকি লাকি  বল্ডউইন  ১৮৮৫ সালে এই ঘোড়ার খুরাকৃতি লেকের পারে বানিয়েছিলেন।  লেকের উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত   ঝরনার জল এই লেকে এসে পড়েছে। এখানে এই ধরনের জলের ব্যবস্থা ছাড়া  আর্টেজিও কূপের ব্যবস্থা ছিল।  এত সুন্দর পাতাওয়ালা ,নানা রঙিন ফুলের গাছে ঢাকা আর্বরেটামের  সমস্ত দৃশ্য ক্যামেরাতে ধরে রাখা অসম্ভব। মনের স্মৃতিকোঠায়  ওদের রেখে দেওয়াই ভালো।  আর ছবি তোলা  তো আরও দু:সাধ্য। গাড়ির   গতির সাথে তাল মিলিয়ে ছবি তুলতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তাতে কিছু পাহাড়ী ঝরনার দেখা পেলাম।  ওখানে নেমে পরে ছবি  ইচ্ছার কথা  চালক কে জানিয়েও লাভ হলো না।  












পার্কের এক পাশে  ধুম্রজালের ভিতর দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সেই বিস্তৃত সান গাব্রিয়েল পর্বত শ্রেণী  দেখতে পেযেছিলাম। এই পাহাড় আর্কেডিয়ার সমস্ত জায়গা থেকে দেখতে পাওয়া যায়।  এই পটভূমিকাতে বাগানের ভিতর দিয়ে যেতে বেশ রোমাঞ্চকর লাগছিল। বাগানের মধ্যে স্প্রিন্ক্লার দিয়ে বহু জায়গাতে বড় বড় গাছগুলিকে ধুয়ে দিতে দেখছিলাম। বাগানের এত বড় কর্ম যজ্ঞ বেশ সুশৃঙ্খলভাবে হতে দেখলাম। এইভাবে নানা সুদৃশ্য গাছপালার মধ্যে দিয়ে আমাদের চক্রাকার পরিভ্রমণের সমাপ্তি ঘটল।  





মিনিট চল্লিশ ধরে ট্রামে এই উদ্যান পরিভ্রমণ শেষ করে আমরা এখানের বিখ্যাত গ্রীন হাউসের দিকে চললাম।  এখানে বিভিন্ন ধরনের দুষ্প্রাপ্য অর্কিড ও অন্যান্য উদ্ভিদের সমারোহ আছে শুনেছিলাম। পথে যেতে ঝাউগাছ দিয়ে ঘেরা একটি প্রান্তর অতিক্রম করলাম। শুনলাম ওখানে নাকি নানা  ধরনের অনুষ্ঠান ও কিশোর কিশোরীদের সামার ক্যাম্প কর্মসূচী পালন করা হয়।  

এই প্রান্তর অতিক্রম করে গ্রীন হাউসে ঢোকবার মুখে বেশ কয়েকটি অপরূপ ক্যাকটাস দেখতে  পেলাম।  এত সুন্দর এবং বড়সড়  জাতের ক্যাকটাস সচরাচর আমাদের কলকাতার সমতলভূমিতে চোখে পড়ে নি।  জানি না উত্তর বঙ্গের কালিম্পঙ এর  বড় বড় নার্সারিতে এধরনের প্রজাতির ক্যাকটাস পাওয়া যায় কি না! 



গ্রীন হাউসে ঢোকার মুখেই বেশ চমক. একটি মোচা  জাতীয় ফুলের শোভা  দেখে মুগ্ধ হলাম।  ওটির ছবি তুলে গ্রীন হাউসের ভিতরে প্রবেশ করলাম। সেখানে সুন্দর বাতাবরণ সৃষ্টি করা হয়েছে এই সব দুষ্প্রাপ্য রকমের অর্কিড ও অন্যান্য এখানের উপযোগী উদ্ভিদের উত্পাদন ও সংরক্ষণের জন্যে। এখানেই জীবনে প্রথম পতঙ্গভুক উদ্ভিদের দেখা পেলাম। এদের কথা বইতে পড়েছি ও সেখানেই ছবি দেখেছি। স্বচক্ষে এই প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ। ছোট কলসির আকারের উদ্ভিদগুলো এমনভাবে উপর থেকে ঝুলছে যে  সামনে থেকেও ওদের পতঙ্গ ধরার কার্যকারিতা বোঝা মুস্কিল। 





ভিতরে কৃত্রিম ছোট ছোট প্রস্রবণ বানিয়ে তার চারপাশে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। নানা  রকম কলাকৌশল প্রয়োগ করে এই সমস্ত দুষ্প্রাপ্য উদ্ভিদ্গুলির প্রজননের  সুন্দর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানেও ভিতরে এত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে সব   কিছু সুবিন্যস্ত করে রাখা হয়েছে যে চোখ ফেরানো মুস্কিল। এখানের এই মুগ্ধকর স্মৃতিগুলোকে মনে ধরে রাখবার জন্যে কিছু ছবি নিচে সন্নিবিষ্ট করলাম। আশা করি পাঠকদের ভালো লাগবে।



















সকাল থেকে আবহাওযা  বেশ ভালো ছিল।  রোদের তেজ তেমন চড়া ছিল না।  বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদের তাপ বাড়তে থাকায় আমরা সকলেই বেশ পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সাময়িক বিশ্রামের জন্যে আমরা কফি কর্নারের দিকে পা চালালাম। কাফেতে যখন কিছু খাবার ও ঠান্ডা পানীয়ের জন্যে অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছিলাম তখন কাফের ঢাকা বারান্দাতে আবার ময়ূরের ঝাঁকের আবির্ভাব। চারিদিকে নির্ভয়ে ওদের বিচরণ।  আমার নাতনী অবন্তী তো ওদের দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওদের কাছে ছুটে গেল।  ওরাও নাতনীকে দেখে যেন ভাবখানা " দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।" ওদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।  একই সঙ্গে বসে রইল।  ওদের সাথে কত কথা বললো আমার নাতনী। ওরাও ওদের বন্ধুকে ভালো ভাবে চিনে নিয়ে নিরীক্ষণ করতে লাগলো।  




কিছুক্ষণ বাদে আমরা সবাই ময়ূরদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আর্বরেটামের গিফট সেন্টারের দিকে চললাম। ওখানে ঢোকার আগেই গিফট সেন্টারের সামনে সুসজ্জিত ভাবে এখানের নানা প্রকার  ক্যাকটাস, সাকুলেনটের  কিছু সাজি   দেখতে পেলাম। বেশ সুন্দর সংগ্রহ। 



গিফট সেন্টারে নানা ধরনের উপহার সামগ্রী, আর্বরেটামের উপরে লেখা নানা রকমের বই, পিকচার পোস্ট কার্ড ও অন্যান্য আকর্ষনীয় সম্ভার দেখা গেল।  আর্বরেটামের স্মৃতি হিসাবে কিছু জিনিসপত্র কিনে   এবারে বাড়ি ফেরার পালা । অবিস্মরণীয়  আর্বরেটাম এবং ততোধিক মনোরম ময়ূরের ঝাঁকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরে চললাম এক মধুর আবেশের মধ্যে দিয়ে। 
 আর্বরেটামের এই কাহিনী শেষ করার আগে পাঠক সাধারণের কৌতূহল নিরসনের জন্যে এই বাগানের কিছু পূর্বতন ইতিহাস বলে যেতে চাই।  প্রায় তিন হাজার বছর আগে এই আর্বরেটাম ও বোটানিক্যাল গার্ডেন আলাউপকিনা ( Aleupigna) অর্থাত অনেক জলের উত্স হিসাবে পরিচিত ছিল।  দুশো বছর আগে ক্যালিফোর্নিয়াতে স্প্যানিশ অধিবাসীদের আগমনের পরে এই আলাউপকিনার অধিবাসীরা গ্যাব্রিযেলিনো নামে পরিচিত ছিলেন। এই জায়গাটা নামের পরিবর্তন ঘটিয়ে স্যান্টা আনিটা হয়ে গেল।  এই জায়গাটা সান গ্যাব্রিয়েল মিশনের কৃষিভিত্তিক কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত হলো।  মেক্সিকোর অধিবাসী কিন্তু জাতিতে স্কটিশ হুগো রিড নামে এক ভদ্রলোক এক গ্যাব্রিলিয়েনো মহিলাকে বিবাহ করে এই স্যান্টা আনিটা র স্বত্তাধিকার পেলেন এবং ১৮৪০ সালে এই লেকের ধারে এক সুন্দর বাড়ি তৈরী করেন। 
 ইলিয়াস লাকি বল্ড উইন ১৮৭৫ সালে এই রাঞ্চ স্যান্টা আনিটা কিনে নিলেন।  এর ফলে তিনি এখানকার সম্পত্তির  অন্তর্গত লেক ও অন্যান্য জলাশয়ের অধিকারী হলেন। এ ছাড়া তাঁর বাসস্থানের উত্তরের বড় ছোট স্যান্টা  আনিটা ক্যানিয়নের অধিকার নিয়ে নিলেন। বল্ডউইন রানচ ২০০০ একর বিস্তৃত এক আর্টেজীও  বেল্টের উপর অধিষ্ঠিত ছিল।  রেমন্ড পাহাড়ের ফল্টের উপরের অবস্থিতির কারণেই এই আর্টেজীয় উত্সের উতপত্তি। বল্ড উইন রান্চের সেচের   জন্যে শতকরা   ৬০ ভাগ আর্টেজীয় উত্স থেকে এবং বাকি ৪০ ভাগ ক্যানিয়নের জল থেকে পাওয়া যেত।  এই বল্ডউইন লেক ১৮৮০ সালের শেষ দিকে আরও ১২-১৫ ফুট গভীর করে কাটানো হয়।   চারিধারে গ্রানাইট পাথরের পাচিল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়।  
বল্ড উইনের বেলভেডিয়ার যা আজকে কুইন এনের কটেজ নামে পরিচিত, ১৮৮৫ সালে ঘোড়ার খুরের লেকের থেকে বেরিয়ে আসা এক খন্ড জমির উপর প্রস্তুত করা হয়েছিল। লেকে জল সরবরাহকারী ঝর্নাগুলির উত্স ছিল উত্তর ও দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথে। লাকি বল্ড উইন আর্কেডিয়ার অধিবাসীদের উচ্চ মানের ক্যানিয়ন ও আর্টেজীয জলের সরবরাহ করতে শুরু করলেন। লাকি বল্ড উইন কিন্তু কোনও দিন ওই সুদৃশ্য এন কটেজে থাকেন নি।  আর্বরেটামের অবাধ বনভূমি ক্রমাগত জঙ্গলের রূপ নিতে শুরু করলো।  ১৯৩০ সালের পর থেকে হলিউড এখানের ঘন জঙ্গলের পটভূমিকায় আকৃষ্ট হয়।  ফলে বেশ কয়েকটি টিভি শো ,সিনেমা ও কমার্শিয়াল চিত্রগ্রহণ শুরু হয়ে যায়।  এর প্রথমটি হচ্ছে জনপ্রিয় টারজান সিরিজ।  টিভি সিরিজ  ফ্যানটাসী আইল্যান্ডের চিত্রগ্রহণ আর্কেডিয়ার এই আর্বরেটামেই সম্পন্ন হয়।  আজ এই বোটানিক্যাল গার্ডেন এই ব্যবসার সাথে  ওতপ্রত ভাবে জড়িত।  
আর্বরেটামের  বিভিন্ন প্রকারের সুদৃশ্য গাছপালা ও ময়ূরের আকর্ষণ ছাড়াও এখানে সব বয়সের লোকেদের জন্যে বিভিন্ন ধরনের মনোরঞ্জক অনুষ্ঠান বছরব্যাপী লেগেই থাকে। মাসের তৃতীয় রবিবার পারিবারিক পিকনিকের জন্যে ব্যবস্থা করা হয়।  এখানে গ্রীষ্মকালে বাচ্চাদের জন্যে বনসৃজন ও জঙ্গল সংরক্ষণের উপর সামার ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়।  বিভিন্ন সময়ে এখানে নানা ধরনের বিশেষ গাছের প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা আছে ।  ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাস নিয়ে ট্যুরের ব্যবস্থাও করা হয়।  এখানের সবচেয়ে বিশেষ উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান হয়  ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। এখানে লস এঞ্জেলস ফিলাহার্মনিক মুক্তাঙ্গনে বিভিন্ন ধরনের কনসার্টের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।  সমস্ত ক্যালিফোর্নিয়ার অধিবাসীরা এইসব কনসার্টের জন্যে উত্সুক হয়ে  অপেক্ষা  করে।  

এখানেই ইতি টানলাম আর্কেডিয়ার বিখ্যাত আর্বরেটাম ও তার ময়ূর্ মহল নিয়ে বিশদ বিবরণের কাহিনী।  

তবে অপ্রাসঙ্গিক হবে কি না জানি না, তবুও ময়ূরের পেখম তোলা  এবং বর্ষার কোনো চিহ্ন না থাকা সত্ত্বেও ময়ূরদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সেই গানের কয়েকটি কলি মনের মধ্যে গুন গুন করতে করতে বাড়ি ফিরে   চললাম। 

 হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে।  
শত বরনের ভাব- উচ্ছ্বাস   কলাপের মতো  করেছে বিকাশ ,
আকুল পরান  আকাশে চাহিয়া উল্লাসে কারে যাচে  রে। 


Thursday, July 17, 2014

রবীন্দ্রনাথের বিবাহের বিশদ বিবরণ


রবীন্দ্রনাথের বিবাহের গল্প বহুবার বহু জায়গাতে আলোচিত ও চর্চিত হয়েছে। খুবই অনাড়ম্বর ভাবে এই বিবাহ সম্পন্ন হলেও  সমস্ত কিছু নিয়ম কানুন মানা হয়েছিল। ঠাকুর বাড়ির সবাই এই বিবাহে খুবই আনন্দ করেছিলেন , ব্যতিক্রম শুধু একজন। তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি।  তবুও বিবাহের আগে মেয়ে দেখার সময়ের কিছু কৌতুকজনক  ঘটনা পুনরায় স্মরণ করা যেতে পারে।

 ১৯৩৮ সালের ২১সে মে সর্বপ্রথম উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকা মংপুতে তাঁর স্নেহধন্যা মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন।  সেই সময় কথা প্রসঙ্গে মৈত্রেয়ী দেবী কবিবরকে তাঁর বিবাহের গল্প শোনাতে অনুরোধ করেন।

তাতে রবীন্দ্রনাথ বলে ওঠেন, "আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই।  বৌঠানেরা যখন বেশি পেড়াপেড়ি শুরু করেন। আমি বল্লুম ,তোমরা যা হয় কর ,আমার কোনো মতামত নেই। তাঁরাই যশোরে গিয়েছিলেন ,আমি যাইনি।  আমি বলেছিলাম ,আমি কোথাও যাব না, এখানেই বিয়ে হবে। জোড়াসাকোতে হয়েছিল। "
"সে কি, আপনি বিয়ে করতে যশোরে যাননি ?"
"কেন যাব ? আমার একটা মান নেই?"
"ভীষণ অহংকার !"
"তা হোক,তাঁরা তোমাদের মত আধুনিকা তো ছিলেন না, এসেছিলেন তো !"

রবীন্দ্রনাথের প্রথাগত বিবাহের মেয়ে দেখতে যাওয়ার আগে আরো দু একটি জায়গাতে পাত্রী দেখার কথা হয়েছিল। সেগুলো বেশ মজার ও তথ্যের দিক দিয়ে ভারী আকর্ষক। রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীকেই পরিহাসছলে একটি মেয়ের দেখা সবিস্তারে বলেছিলেন। তাঁর কথায় , "জানো একবার আমার একটি বিদেশী অর্থাত অন্য province-এর মেয়ের সঙ্গে বিয়ের কথা হয়েছিল।  সে এক পয়সাওয়ালা লোকের মেয়ে ,জমিদার আর কি ,বড় গোছের। সাত লক্ষ্ টাকার উত্তরাধিকারিণী সে।  আমরা কয়েকজন মেয়ে দেখতে গেলুম ,দুটি অল্পবয়সী মেয়ে এসে বসলেন- একটি নেহাত সাদাসিধে ,জড় ভরতের মত এক কোণে ব'সে রইলো ; আর একটি যেমন সুন্দরী ,তেমনি চটপটে।  চমতকার তাঁর স্মার্টনেস।  একটু জড়তা নেই,বিশুদ্ধ ইংরাজি উচ্চারণ। পিয়ানো বাজালে ভালো -তারপরে music সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হ'ল। আমি ভাবলুম এর আর কথা কি? এখন পেলে হয়!-এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকলেন। বয়স হয়েছে,কিন্তু সৌখীন  লোক. ঢুকেই পরিচয় করিয়ে দিলেন মেয়েদের সঙ্গে। সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন ,-'Here is my wife' এবং জড়ভরতটিকে  দেখিয়ে 'Here is my daughter'--আমরা আর ক'রব কি, পরস্পর মুখ চাওয়া চাওযি ক'রে চুপ ক'রেই রইলুম ; আরে তাই যদি হবে তবে ভদ্রলোকদের ডেকে   এনে নাকাল করা কেন! যাক , এখন মাঝে মাঝে অনুশোচনা হয়।  -- যাহোক ,হ'লে এমনই কি মন্দ হ'ত। মেয়ে যেমন ই হোক না কেন, সাত লক্ষ টাকা থাকলে বিশ্বভারতীর জন্যে তো এ হাঙ্গামা করতে হ'ত না. তবে শুনেছি সে মেয়ে নাকি বিয়ের বছর দুই পরেই বিধবা হয়। তাই ভাবি ভালই হয়েছে ,কারণ স্ত্রী  বিধবা হলে  আবার প্রাণ রাখা শক্ত। "

সীতা দেবীও কবির কাছে শুনেছিলেন সেই ঘটনা ,"পুন্যস্মৃতি ' তে জানিয়েছেন' এক মান্দ্রাজি জমিদার কি রকম ভাবে তাঁহাকে কন্যাদান করিবার চেষ্টায় ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন ,সে গল্প শুনিলাম। গল্প শেষ করিয়া বলিলেন, ,'সে বিয়ে যদি করতুম তা হলে আর আজ কাছে দাঁড়াতে পারতে? সাত লাখ টাকা আয়ের জমিদারির মালিক হয়ে, কানে হীরের কুণ্ডল পরে, মান্দ্রাজে বসে থাকতুম ,তা না এখন two ends meet করতে পারিনে ,বসে বসে কবিতা লিখছি। '

সাত লাখ টাকার উত্তরাধিকারিণীকে 'মদ্রজা' কে যে ঠাকুরবাড়ির কেউ পছন্দ করেন নি , রবীন্দ্রনাথের বড় দা  দ্বিজেন্দ্রনাথের বহুপঠিত কবিতাটি তার প্রমাণ :
                        ---' অনিন্দিতা স্বর্ণ- মৃণালিনী হোক
                          সুবর্ণ তুলির তব পুরস্কার। মদ্রজার কারে
                           যে পড়ে  সে পড়ুক খাইয়া চোক। '
এ কবিতা লেখা হয় যে বছর অগ্রহায়ণ মাসে রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিল ,সেই বছরেরই  জৈষ্ঠ মাসে।  

রবীন্দ্রনাথের দৌহিত্রী নন্দিতার স্বামী কৃষ্ণ কৃপালনী রবীন্দ্রজীবনী লেখার সময়ে মাদ্রাজের মেয়ের পরিবর্তে ওড়িশার একটি মেয়ের উল্লেখ করেছেন।

ওড়িশায় ঠাকুর বংশের জমিদারী ছিল ,কাজেই সেখানকার আর এক জমিদার সুদর্শন কবিকে জামাতা করতে চাইলে অবাক হবার কিছু নেই।  তিনি আরও লিখেছেন,জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ দুই ভাই মিলে  রাজবাড়িতে  মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। তবে এর থেকে আর বিশেষ কিছু জানা যায় নি এই বিবাহের সম্বন্ধের ব্যাপারে।

অপরদিকে আসামের জমিদার জানদাভিরামের  আত্মজীবনী 'মোর কথা ' থেকে পাচ্ছি একটি খেদোক্তি। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ,'ভগবানের কি ইচ্ছা ! কবি-গুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বড় দিদির বিয়ে হলো না, কিন্তু বড় দিদির ছোট ভাই আমার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞ দার্শনিক বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের মেজ ছেলে অরুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা লতিকা দেবীর বিয়ে হয় ১৯০৬ সালের ১লা জুলাই। মানুষের মতের কত পরিবর্তন হয়।  এই বিয়ে আবার বড়দিদি স্বর্ণলতা দেবী ই দিয়েছিলেন। তার পর ঠাকুরবাড়িতে কত বিধবা বিবাহ হচ্ছে। '  ঊষারঞ্জন  ভট্টাচার্য মহাশয় তাঁর 'রবীন্দ্রনাথ ও অসম ' গ্রন্থে জ্জানদাভিরামের এই উক্তি অবলম্বন করেই জানিয়েছেন , 'জ্জানদাভিরামের রচনা ' 'মোর কথা' থেকে জানা যায় তাঁর দিদি স্বর্ণলতা দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ-সম্বন্ধ হয়েছিল। 

কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ যখন জানলেন যে এই সুন্দরী ও সুশীলা   পাত্রীটি  বিধবা তখন আর এগোতে রাজী হলেন না।  কবির সঙ্গে জ্জানদাভিরামের হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ,ফলে কবি তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে বহুবার কৌতুক করেছেন।  শুধু তাই নয় 'ছবি তোলার প্রস্তাব হতেই কবি কৌতুকের সুরে ইরাকে বললেন, তোর পিসিকে তো পাইনি ,তুই কাছে থাকলে ছবি তোলায় আপত্তি নেই.' লিখেছেন শ্রী ভট্টাচার্য। 

এবারে প্রশ্ন , রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে স্বর্ণলতার বিবাহ সম্বন্ধ কবে উঠেছিল ? শ্রী ভট্টাচার্যের মতে, দেবেন্দ্রনাথের প্রাথমিক অনুমোদন থাকলেও পাত্রী বিধবা বলে তিনি পরে আপত্তি জানান। কিন্তু লক্ষীনাথ বেজবরুয়ার তাঁর জীবনস্মৃতিতে জানিয়েছেন, স্বর্ণলতা বিধবা হন ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ৩১সে মার্চ আর তাঁর পুনর্বিবাহ হয় ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই ফেব্রুয়ারি।  লক্ষিনাথ ছিলেন বিয়ের অন্যতম সাক্ষী।  তা ছাড়া এই সময়ে কবিপত্নী জীবিত ছিলেন ,রবীন্দ্রজীবনে তিনি এসেছিলেন ১৮৮৩ সালের ৯ই ডিসেম্বর ,বিদায় নিয়েছিলেন ১৯০২ সালের ২৩সে নভেম্বর। তাহলে? 

ইরা জানিয়েছেন, এর প্রতিটি ঘটনাই সত্যি। তবে স্বর্ণলতার সঙ্গে কবির বিয়ের কথা হয়েছিল ১৮৮৩ সালের কোনও এক সময়ে,তখন স্বর্ণলতার একবারও বিয়ে হয় নি।  রায়বাহাদুর গুণাভিরাম বরুয়া ছিলেন উদারহৃদয় ব্যক্তি ,'আসামবন্ধু ' র প্রতিষ্ঠাতা -সম্পাদক। সুকিয়া স্ট্রীটের অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদ্যোগে বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। ১৮৯৯ সালে ব্রাহ্মধর্মে  দীক্ষিত  হয়েছিলেন। স্ত্রী ব্রজসুন্দরীর অকাল প্রয়াণের পরে তিনি দুই সন্তানের জননী বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিবাহ  করেন।  

স্বর্ণলতা এঁদেরই কন্যা। অত্যন্ত রূপসী স্বর্ণলতা বেথুন স্কুলে পড়তেন ও পরবর্তীকালে লেখিকা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকেই প্রথম মহিলা সাংবাদিকের মর্যাদা দেওয়া হয়।  ষোলো বছর ধরে তিনি এসোসিয়েটেড প্রেসে সংবাদ সরবরাহ করেন। ঠাকুরবাড়ির উতসবে তিনি পিতা গুণাভিরামের বরুয়ার সঙ্গে এসেছিলেন এবং তখনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বিবাহ-সম্বন্ধ হয়।  এই প্রস্তাবে কবির অনুমোদন ছিল , হয়ত সেই সম্ভাবনাতেই দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথ খুশি হয়ে কবিতায় লিখেছিলেন ' অনিন্দিতা স্বর্ণ- মৃণালিনী হোক সুবর্ণ তুলির তব পুরস্কার। 'কিন্তু অনুসন্ধানের পরে মহর্ষি যখন শুনলেন , স্বর্ণলতা বিধবার সন্তান তখন সম্বন্ধ ভেঙে যায়।

স্বর্ণলতার সঙ্গে কবির বিবাহ প্রস্তাবটির কথা কেউ কখনও বলেননি, সম্ভবত কবি নিজে তা সংগোপনে রেখেছিলেন বলে।  পরে শুধু জ্জানদাভিরাম ও তাঁর মেয়ে ইরার সঙ্গে এ নিয়ে কৌতুকের সুরে কথা বলতে শোনা গিয়েছে। যে সময়ে তিনি ইরাকে তার পিসির কথা তুলে ঠাট্টা করেছেন ,মনে রাখতে হবে ,তখন স্বর্ণলতাও আর ইহলোকে নেই. তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৩২ সালে। জ্জানদাভিরাম তাঁর দিদিকে খুব ভালবাসতেন ,তাই সেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ের সঙ্গে যখন তাঁর বিয়ে হল ,তখন দিদির বিয়ে না হওয়ার কথাটি বিশেষ করে মনে পড়েছিল।  আসলে ঠাকুরবাড়িতে মহর্ষি বিধবা বিবাহের বিপক্ষে থাকায় জ্জানদাভিরামের সঙ্গে লতিকার বিয়ে হয় মহর্ষির মৃত্যুর পরে। স্বর্ণলতার আগ্রহেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ে  লতিকা বরুয়া  পরিবারে বধূ হয়ে আসেন।

পূর্বোল্লিখিত দুইটি পাত্রী দেখার সম্ভাবনা নাকচ হবার পরে  রবীন্দ্রনাথের বিবাহ নিয়ে তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল।তখন বাড়ির অভিভাবকেরা এই বঙ্গের উপযুক্ত জায়গা থেকে পাত্রী দেখার সিদ্ধান্ত নেন।   অবনীন্দ্রনাথের ঘরোয়া বইটিতে তাঁর স্মৃতিকথায় তিনি লেখেন, 'রবিকাকার বিয়ে আর হয় না; সবাই বলেন,বিয়ে করো -বিয়ে করো এবারে, রবিকাকা রাজি হন না, চুপ করে ঘাড় হেঁট করে থাকেন।  শেষে তাঁকে তো সবাই মাইল বুঝিয়ে রাজি করালেন। ' এ ব্যাপারে মহর্ষির নিশ্চয়ই কিছু চাপ ছিল এবং সেজন্যে তিনি সেপ্টেম্বর মাসে কবিকে মুসৌরিতে ডেকে পাঠান।  রবীন্দ্রনাথ মুসৌরিতে যাবার কিছুদিন পরেই তাঁর বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয় এবং সেরেস্তার কর্মচারী অভয় চরণ ঘোষকে যশোরে পাঠানোর সংবাদ পাওয়া যায়।  কিন্তু তাতে তেমন কোনো খোঁজ খবর না পাওয়াতে রবীন্দ্রনাথের বৌদিরা দলবেধে মেয়ে দেখতে যান যশোর খুলনাতে।  

এই মেয়ে দেখার দলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কি না, সেই বিষয় নিয়ে মতান্তর আছে. রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন তিনি কনে দেখতে যান নি ,কিন্তু ইন্দিরা দেবী চৌধারিণী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন কনে দেখার দলে তাঁর 'রবিকাকা' -ও  ছিলেন। অবশ্য দু'জনেই তাঁদের শেষ জীবনে স্মৃতিচারণ করেছেন-কারো একজনের বিভ্রম ঘটা অস্বাভাবিক নয়।  কবির বৌঠানেরা অর্থাত জ্জানদানন্দিনী দেবী, কাদম্বরী দেবী , জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, বালক সুরেন্দ্রনাথ ও বালিকা ইন্দিরা ও সঙ্গে একুশ বাইশ বছরের নব যৌবনের কবিকে নিয়ে পাত্রীর সন্ধানে জ্জানদানন্দিনী দেবীর বাপের বাড়ি নরেন্দ্রপুর গ্রামে আশ্রয় নেন।  ইন্দিরা দেবীর মামার বাড়ি  মাটির বাড়ি, খড়ের চাল, উঁচু  রোযাক।  মাটির আঙিনা।  আশেপাশে বাগান-পুকুর। 

এখানেই বালিকা ইন্দিরা তাঁর জ্যোতিকাকা ও রবি কাকার কাছে  ঘড়ি-দেখা শিখলেন। মা-কাকীরা পাত্রী খুঁজতে এ-পাড়া  ও-পাড়া যান, আর দুই কাকা বাড়িতে শিশুদের সঙ্গ দেন. প্রায়ই তাঁরা রবীন্দ্রনাথের জন্যে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কনে দেখতে গেলেও ,তাঁদের পছন্দমত একটি সুন্দরী পাত্রীও খুঁজে পেলেন না।  যশোরে পিরালী ব্রাহ্মণদের একটা আড্ডা ছিল,তাই জোড়া সাঁকোর  বৌয়েরা  অধিকাংশ সেখান থেকেই আসতো।  তাদের সুন্দরী  বলে একটা নাম ছিল. কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় নির্বাচক মন্ডলীর কাছে কোনো সুন্দরী নজরে পড়ল না।  দক্ষিণ ডিহি ,চেঙট প্রভৃতি সব পাড়া খুঁজেও মনের মত মেয়ে পেলেন না।  অবশেষে খুলনা জেলার দক্ষিণে ডিহি ফুলতলা গ্রামের বেনীমাধব রায়্চৌধুরীর একমাত্র কন্যা ফুলি ওরফে   ভবতারিণী কে  মনোনীত করা হলো।  

শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ নিজেও পাত্রীকে মনোনীত করেছিলেন। তবে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।  রবীন্দ্রজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল মন্তব্য করেছিলেন, ' রবীন্দ্রনাথ স্বেচ্ছায় একটি দশ বছরের কম প্রায় অশিক্ষিতা মেয়েকে ভাবী জীবনসঙ্গিনী  মনোনীত করবেন একথা বিশ্বাস করা কঠিন।' ভবতারিণীর গাত্রবর্ণ শ্যামলা ছিল এবং তাঁকে সুন্দরী বলা চলে না।  কবি কনের এই শ্যামলা রংটিকেই পছন্দ করেছিলেন। পরে কবিতায় সেই ভাব প্রকাশ করেছিলেন এই ভাবে, 'যে দেখায় সে আমার মন ভুলিয়েছে / তাতে আছে যেন এই মাটির শ্যামল অঞ্জন ,/ ওর কচি  ধানের চিকণ আভা। ' বিবাহের সময় ভবতারিণীর বয়স ছিল নয় বছর নয় মাস, জন্মতারিখ ১লা মার্চ,১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ। কবি কনের পিতৃগৃহের  পরিচয় অথবা কনে দেখার বিবরণ কাউকেই বলেননি ,কিন্তু পরিহাসছলে বলে গেছেন শাশুরির ১০৮ পদ রান্নার কাহিনীটি। আর কাব্যে উপন্যাসে কনের পিতৃ গৃহের পরিচয় ও গ্রাম্য পথের বিবরণ লিখে গেছেন।  'ধরাতলে দীনতম ঘরে/ যদি জন্মে প্রেয়সী আমার ,নদীতীরে / কোন -এক গ্রাম্ প্রান্তে প্রচ্ছন্ন কুটিরে / অশ্বত্থ ছায়ায় ,সে বালিকাবক্ষে  তার / রাখিবে সঞ্চয় করি সুধার ভান্ডার / আমারি লাগিয়া সযতনে। ' অর্থাত ফুলতলি গ্রামের প্রান্তদেশে নদীর ধারে অশ্বত্থ  গাছের ছায়ায় যে কুটির রয়েছে ,সেই দীনতম ঘরের বালিকাকেই কবি দেখতে গিয়েছিলেন।


ইন্দিরা দেবী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে যশুরে মেয়েদের মধ্যে সাধারণ গুণের ও  তাঁদের মিশুকে ও পরকে আপন  করার ক্ষমতা ভবতারিনীর মধ্যে পূর্ণভাবে প্রকাশিত হতে দেখেছিলেন। আর তাঁর রবিকাকার এই অসম বিবাহের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, 'রবিকাকার মত অমন গুণবান ,রূপবান ,ভাগ্যবান, ধনবান, খ্যাতিমান (ভবিষ্যতের মত না হলেও যথেষ্ট ) যুবাপুরুষ , গুরুজনেরা যে মেয়েকে হাতে তুলে দিলেন , বিনা বাক্যব্যয়ে নির্বিবাদে কী করে তাকেই বিয়ে করতে রাজি হলেন ও পরে সুখে স্বচ্ছন্দে ঘর করতে লাগলেন, ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়।  অথচ আজকাল কত কথা শোনা যায় যে ,স্ত্রী শিক্ষিতা নাহলে শিক্ষিত স্বামীর সঙ্গে মিশ  খাবে কী করে ইত্যাদি। সেকালে ওঁদের  স্ত্রীরা সে হিসাবে কে-ই বা স্বামীর উপযুক্ত ছিলেন ? অথচ ওঁরা সর্বদা তাঁদের  যথেষ্ট মেনে চলতেন, গৃহলক্ষীর সম্মান দিতেন।'

কনে দেখার পালা সঙ্গ করে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ  তাঁর স্ত্রী কাদম্বরী দেবী , দিদি সৌদামিনী , জ্ঞানদানন্দিনী  দেবী ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মস্থল বম্বের কারোয়ারে যান।  কারোয়ার থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ,কাদম্বরী দেবী ও রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতায় ফিরে আসার পরেই রবীন্দ্রনাথের বিবাহের আয়োজন শুরু হয়ে যায়।  এরই ফলশ্রুতি স্বরূপ ১৮৮৩ খ্রীস্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর  বিবাহের দিন ধার্য হয়।  তবে এই বিবাহে জ্জানদানন্দিনী দেবী ও সৌদামিনী দেবী কারয়ারে থেকে যাওয়ায় বিবাহে অনুপস্থিত ছিলেন। ঠিক এই সময়ে আকস্মিক সৌদামিনী দেবীর স্বামী শ্রী সরদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়ে   বিবাহ বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে।  অন্যদিকে প্রথমে উতসাহ ও উদ্দেপনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অতি  প্রিয় নতুন বৌঠান পাত্রী দেখতে গেলেও , কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বিবাহ  সমারোহে  যোগ দেন নি।  এই সব কারণে কবি   নিজেকে অনাদৃত বলে উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় অত্যন্ত সাধারণ ভাবে।  কোনো জাঁকজমক হয় নি।  

অথচ রবীন্দ্রনাথ শৈশব থেকেই এই বিশেষ দিনটির স্বপ্ন দেখতেন। কারণ শৈশবে কৈলাশ মুকুজ্জের সালঙ্কারা বধূর বিবাহের উতসবের বর্ণনা বালক বয়সে শুনেই সেটিকেই যুবক রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ের গোপন লালন করে এসেছিলেন। তাই তাঁর বিবাহ জাঁক -জমকের  সঙ্গে হয়নি বলে চিরকাল কবির মনে আক্ষেপ  ছিল।  সেই আক্ষেপ মাঝে মাঝে আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রকাশ করতেন। সেজন্যে মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীকে বিয়ের ব্যাপারে বলেছিলেন,  'আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই।  --- নিজের বিয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই, সে কথা উত্থাপণ মাত্র হেসে উড়িয়ে দেবে ,অথচ পরের বিয়ের পদ্য লেখ।'  কবির মনের এই গোপন আকাঙ্খা তাঁর আকাশ প্রদীপ কাব্যের 'বধূ'  কবিতায় সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন।তবে কবির ইচ্ছামত পাত্রী ভবতারিণীকে  জোড়া সাঁকোতে  সুসজ্জিত করে এনে বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়।

 তবুও আনন্দের সঙ্গে  রবীন্দ্রনাথ নিজের বিবাহের এক অভিনব নিমন্ত্রণপত্র নিজের হাতে লিখে প্রিয় বন্ধু প্রিয়নাথ সেন ও অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবকে পাঠিয়েছিলেন।  এই পত্রটির মাথায় ভোরের পাখির প্রথম আবির্ভাবের সঙ্গে  সূর্যোদয়ের ছবির নীচে মধুসূদন দত্তের কবিতা 'আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হয়' -লিখে তারই পাশে লিখলেন  ' আমার Motto নহে। '

প্রিয় বাবু,
              আগামী রবিবার ২৪ অগ্রহায়ণ  তারিখে শুভদিনে শুভলগ্নে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ বিবাহ হইবেক। আপনি তদুপলক্ষে বৈকালে উক্ত দিবসে ৬নং জোড়াসাঁকোস্থ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভবনে উপস্থিত থাকিয়া বিবাহদি  সন্দর্শন করিয়া আমাকে এবং আত্মীযবর্গকে বাধিত করিবেন।
                                    ইতি
                                         অনুগত
                                শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 একটি সূত্রে জানা যায় , রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভবতারিণীর  বিবাহের ঘটকালি করেন কবির মাতুল ব্রজেন্দ্রনাথ রায়ের পিসিমা আদ্যাসুন্দরী  দেবী। প্রচলিত ঠাকুরবাড়ির রীতি অনুসারে রবীন্দ্রনাথের আইবুড়ো  ভাত অবনীন্দ্রনাথের  বাড়িতেই হয়।  অবনীন্দ্রনাথের মা রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী ভবতারিণীর সম্পর্কে বোন হন ,তাই তিনি  এই বিবাহে খুব খুশী হয়েছিলেন। 

অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায় আছে- 

'মা গায়ে হলুদের পরে রবিকাকাকে আইবুড়ো ভাতে নেমন্তন্ন করলেন।অবনীন্দ্রনাথের বড় পিসিমা কাদম্বিনী  দেবীর ঘরে আইবুড়ো ভাত সাজানো হয়। মা খুব খুশি,ভবতারিণী একে যশোরের মেয়ে তায় সম্পর্কে বোন। বিরাট আয়োজন।পিসিমারা রবিকাকাকে ঘিরে বসেছেন ,এ আমাদের নিজের চোখে দেখা।  রবিকাকা  দৌড়দার শাল গায়ে, লাল কি সবুজ রঙের মনে নেই তবে   খুব জমকালো রঙ চঙের।  বুঝে দেখো, একে রবিকাকা , তায়  ওই  সাজ ,দেখাচ্ছে যেন দিল্লীর বাদশা! তখনই ওঁর কবি বলে খ্যাতি ,পিসিমারা জিজ্ঞাসা করছেন ,কি রে, বউ দেখেছিস ,পছন্দ হয়েছে ,কেমন হবে বউ ইত্যাদি সব।  রবিকাকা ঘাড় হেঁট করে বসে একটু একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছেন,আর লজ্জায় মুখে কথাটি নেই।'

কবি নিজের বিবাহের গল্প কারো কাছে করেন নি কিন্তু কবিতায় টুকরো টুকরো ভাবে বিবাহের স্মৃতি কথা লিখে গেছেন যেমন-'ক্ষণিক মিলনের' দুইখানি দিশেহারা মেঘের বর্ণনার পিছনে রবীন্দ্র মৃণালিনীর অকস্মাত বা  দৈব ঘটিত মিলন কাহিনী যা কাব্যে বহুবার  হয়েছে। সানাই-এর 'হঠাত মিলন' বা অকস্মাত (দৈব ) মিলনের ওড়না ঢাকা মুখের একটুখানি হাসির ঝিলিকের স্মৃতি এবং শেষ সপ্তকের উনত্রিশ সংখ্যক কবিতায় বিবাহের 'অনেক কালের একটি   মাত্র দিনের' স্মৃতির  সঙ্গে  ধূপছায়া রঙের বেনারসী সাড়ী পরিহিতা, খোপাটি ছাড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া  দন্ডায়মানা বালিকা বধূর আগমনের সঙ্গে  উতসবের সানাই-এর বসন্ত পঞ্চম রাগের স্মৃতি কাব্যে লিখে গেছেন। কবির এই টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোকেই একত্রিত করলেই কবির বিবাহের সুন্দর ছবি আপনিই ফুটে ওঠে।  কবির কথায় - 'বিবাহের প্রথম বতসরে /দিকে দিগন্তরে /সহানায়  বেজেছিল বাঁশি /উঠেছিল কল্লোলিত হাসি। '

এরপরে নিজেরই বাড়িতে পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে এলেন অন্দরমহলে স্ত্রী আচারের সরঞ্জাম যেখানে সাজানো। বরসজ্জার  শাল খানি গায়ে জড়ানো রবীন্দ্রনাথ এসে দাঁড়ালেন পিড়ির উপর।  নতুন কাকিমার আত্মীয়া -যাঁকে সবাই ডাকতেন 'বড় গাঙ্গুলীর  স্ত্রী ' বলে -রবীন্দ্রনাথকে বরণ করলেন তিনি।  তাঁর পরনে ছিল একখানি কালো রঙের বেনারসী জরির ডুরে। বিয়ের সময় কাকিমা ছিলেন খুব রোগা। গ্রামের বালিকা ,শহুরে হাবভাব কিছুই জানতেন না।  কনে এনে সাতপাক ঘোরানো হলো -শেষে বরকনে দালানে চললেন সম্প্রদান স্থলে। বাড়ির অবিবাহিত মেয়েরাও সঙ্গে সঙ্গে  চলল।  আমিও জুটে  গেলুম  তাদের সঙ্গে। দালানের একধারে বসবার জায়গা ছিল আমাদের। দেখলুম সেখানে বসে  সচক্ষে কাকিমার সম্প্রদান।

রবীন্দ্রনাথের জীবনের এই বিরল মুহুর্তে উপস্থিত থাকতে পেরে আনন্দ উচ্ছ্বাসের অন্ত ছিল না অবনীন্দ্রনাথের। আবেগাপ্লুত কন্ঠে রানী চন্দকে বলেছিলেন, ' সে মূর্তি তোমরা আর দেখতে পারবে না, বুঝতে পারবে না বললে -এই আমরাই যা দেখে নিয়েছি।'

সম্প্রদানের পরে বরকনে এসে বাসরে বসলেন। রবীন্দ্রনাথের বউ এলে তাঁর থাকবার জন্যে একটি ঘর নির্দিষ্ট করা ছিল আগে থেকেই। বাসর বসলো সেই ঘরেই।বাসরঘরের সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায় প্রত্যক্ষদর্শী হেমলতা দেবীর লেখায়:   'বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টুমি আরম্ভ করলেন। ভাঁড় কুলো  খেলা আরম্ভ হল।  ভাঁড়ের  চালগুলি ঢালাই -ভরাই হলো ভাঁড় খেলা। রবীন্দ্রনাথ ভাঁড় খেলার বদলে ভাঁড় গুলো উপুর করে দিতে লাগলো ধরে ধরে।  তাঁর ছোট কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী বলে উঠলেন, 'ওকি করিস রবি? এই বুঝি  তোর্ ভাঁড় খেলা? ভাঁড় গুলো সব উল্টে দিচ্ছিস কেন ?' রবীন্দ্রনাথের নিজের বাড়ি নিজেই বর।  তাঁকে শশুরবাড়ি যেতে হয় নি তাই তাঁর লজ্জা সংকোচের কারণ ছিল না. রবীন্দ্রনাথ বললেন, ' জানো না কাকিমা সব যে উলট  পালট হয়ে যাচ্ছে-কাজে কাজেই আমি ভাঁড়  গুলো  উলটে দিচ্ছি।' রবীন্দ্রনাথ বাক সিদ্ধ মানুষ ,কথায় তাঁকে হারাতে পারবে না কেউ।

এবারে বাসরে গান গাইবার পালা। কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী বরবেশী রবীন্দ্রনাথকে বললেন -"তুই একটা গান কর।  তোর  বাসরে আর কে গাইবে, তুই  এমন গাইয়ে থাকতে ? রবীন্দ্রনাথের কন্ঠস্বর তখন কি চমতকার ছিল,সে যারা না শুনেছে  বুঝতে পারবে না।  আমরা যে কানে শুনেছি সে আমাদের কম সৌভাগ্য নয়।  এখন সবই হারিয়ে গেছে,তবু যা পেয়েছি তাই রেখেছি মনে ধরে।  বাসরে গান জুড়ে দিলেন -

 আ- মরি লাবণ্যময়ী
       কে ও স্থির সৌদামিনী ,
পূর্ণিমা -জোছনা দিয়ে
       মার্জিত বদনখানি।
নেহারিয়া রূপ  হায়,
আঁখি না ফিরিতে চায় ,
অপ্সরা   কি বিদ্যাধরী
        কে রূপসী নাহি জানি।

এই গানটি রবীন্দ্রনাথের ন'দি স্বর্ণকুমারী দেবীর রচনা-'বসন্ত উতসব'-এর দ্বিতীয় অঙ্কের গান ।

দুষ্টুমি করে গাইতে লাগলেন কাকিমার দিকে তাকিয়ে। বেচারী কাকিমা (মৃণালিনী দেবী) রবীন্দ্রনাথের কান্ড দেখে জড়োসড়।  ওড়নায় মুখ ঢেকে মাথা হেঁট করে বসে আছেন। আরও একটা গান গেয়েছিলেন  -সেটা আমার স্মরণে নেই।  '

বিবাহ বাসরে ওড়না   ঢাকা একটুখানি হাসির স্মৃতি সানাই-এর 'হঠাত মিলনে' ধরে রেখেছেন কবি- 'আঁচল আড়ে দীপের মতো একটুখানি হাসি ,/ নিবিড় সুখের বেদন দেহে উঠছিল নিশ্বাসি। '

বিবাহের পরে  নববধূ ভবতারিণীর নাম পরিবর্তন করে মৃণালিনী রাখা হয়। এই নতুন নাম দেওয়ার পিছনে অনেকগুলি মত পাওয়া যায়।  একটিতে মৃণালিনী নামটি কবির প্রথম প্রিয়া কৈশরিকা (বীথিকা) নলিনীর নামানুসারে (আন্না তড়খড়) রাখা হয়েছে। ছেলেবেলা কথিকাতে কবি লিখেছেন যে মৃণালিনী নামটি তিনি নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়েই রেখেছিলেন। অন্য একটি মতানুসারে রবীন্দ্রনাথের মান্দ্রাজি পাত্রীকে নাকচ করে এবং সম্ভাব্য পাত্রী স্ব্রর্ণলতাকে দেখে খুসি  হয়ে রবীন্দ্রনাথের বড় দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'যৌতুক কি কৌতুক  ' কাব্যে  'অনিন্দিতা স্বর্ণ-মৃণালিনী হোক ' বলে যে আশীর্বাদ উচ্চারণ করেছিলেন ,তারই সূত্রে এই নাম পরিবর্তন করা  হয়েছিল।

রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় থেকে অনেকেই রবীন্দ্রনাথের পাত্রী নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।  কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মনে কোন সংশয় ছিল না।  তিনি আনন্দের সঙ্গেই তাঁর গ্রাম্য   বালিকা বধূকে প্রথম  দর্শনেই গান দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন- 'দাঁড়ায়েছ সংগীতের শতদল দলে।' (স্মরণ) 
বস্তুত বিবাহকালে বাংলাদেশের তরুণ এবং প্রতিভাবান এবং স্বনামধন্য ঘরের রূপবান সাহিত্যিকের যথার্থ দোসর বা সহধর্মিণী হবার মতো যোগ্যতা অত্যন্ত সাধারণ ঘরের গ্রাম্য মেয়ে ভবতারিণী দেবীর যে ছিল না তা অবশ্য স্বীকার্য। কিন্তু বিবাহের অনতিকাল পরেই রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য  সহৃদয় অভিভাবকত্বে তিনি কবি প্রেযসীরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।