Thursday, July 17, 2014

রবীন্দ্রনাথের বিবাহের বিশদ বিবরণ


রবীন্দ্রনাথের বিবাহের গল্প বহুবার বহু জায়গাতে আলোচিত ও চর্চিত হয়েছে। খুবই অনাড়ম্বর ভাবে এই বিবাহ সম্পন্ন হলেও  সমস্ত কিছু নিয়ম কানুন মানা হয়েছিল। ঠাকুর বাড়ির সবাই এই বিবাহে খুবই আনন্দ করেছিলেন , ব্যতিক্রম শুধু একজন। তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি।  তবুও বিবাহের আগে মেয়ে দেখার সময়ের কিছু কৌতুকজনক  ঘটনা পুনরায় স্মরণ করা যেতে পারে।

 ১৯৩৮ সালের ২১সে মে সর্বপ্রথম উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকা মংপুতে তাঁর স্নেহধন্যা মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন।  সেই সময় কথা প্রসঙ্গে মৈত্রেয়ী দেবী কবিবরকে তাঁর বিবাহের গল্প শোনাতে অনুরোধ করেন।

তাতে রবীন্দ্রনাথ বলে ওঠেন, "আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই।  বৌঠানেরা যখন বেশি পেড়াপেড়ি শুরু করেন। আমি বল্লুম ,তোমরা যা হয় কর ,আমার কোনো মতামত নেই। তাঁরাই যশোরে গিয়েছিলেন ,আমি যাইনি।  আমি বলেছিলাম ,আমি কোথাও যাব না, এখানেই বিয়ে হবে। জোড়াসাকোতে হয়েছিল। "
"সে কি, আপনি বিয়ে করতে যশোরে যাননি ?"
"কেন যাব ? আমার একটা মান নেই?"
"ভীষণ অহংকার !"
"তা হোক,তাঁরা তোমাদের মত আধুনিকা তো ছিলেন না, এসেছিলেন তো !"

রবীন্দ্রনাথের প্রথাগত বিবাহের মেয়ে দেখতে যাওয়ার আগে আরো দু একটি জায়গাতে পাত্রী দেখার কথা হয়েছিল। সেগুলো বেশ মজার ও তথ্যের দিক দিয়ে ভারী আকর্ষক। রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীকেই পরিহাসছলে একটি মেয়ের দেখা সবিস্তারে বলেছিলেন। তাঁর কথায় , "জানো একবার আমার একটি বিদেশী অর্থাত অন্য province-এর মেয়ের সঙ্গে বিয়ের কথা হয়েছিল।  সে এক পয়সাওয়ালা লোকের মেয়ে ,জমিদার আর কি ,বড় গোছের। সাত লক্ষ্ টাকার উত্তরাধিকারিণী সে।  আমরা কয়েকজন মেয়ে দেখতে গেলুম ,দুটি অল্পবয়সী মেয়ে এসে বসলেন- একটি নেহাত সাদাসিধে ,জড় ভরতের মত এক কোণে ব'সে রইলো ; আর একটি যেমন সুন্দরী ,তেমনি চটপটে।  চমতকার তাঁর স্মার্টনেস।  একটু জড়তা নেই,বিশুদ্ধ ইংরাজি উচ্চারণ। পিয়ানো বাজালে ভালো -তারপরে music সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হ'ল। আমি ভাবলুম এর আর কথা কি? এখন পেলে হয়!-এমন সময় বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকলেন। বয়স হয়েছে,কিন্তু সৌখীন  লোক. ঢুকেই পরিচয় করিয়ে দিলেন মেয়েদের সঙ্গে। সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন ,-'Here is my wife' এবং জড়ভরতটিকে  দেখিয়ে 'Here is my daughter'--আমরা আর ক'রব কি, পরস্পর মুখ চাওয়া চাওযি ক'রে চুপ ক'রেই রইলুম ; আরে তাই যদি হবে তবে ভদ্রলোকদের ডেকে   এনে নাকাল করা কেন! যাক , এখন মাঝে মাঝে অনুশোচনা হয়।  -- যাহোক ,হ'লে এমনই কি মন্দ হ'ত। মেয়ে যেমন ই হোক না কেন, সাত লক্ষ টাকা থাকলে বিশ্বভারতীর জন্যে তো এ হাঙ্গামা করতে হ'ত না. তবে শুনেছি সে মেয়ে নাকি বিয়ের বছর দুই পরেই বিধবা হয়। তাই ভাবি ভালই হয়েছে ,কারণ স্ত্রী  বিধবা হলে  আবার প্রাণ রাখা শক্ত। "

সীতা দেবীও কবির কাছে শুনেছিলেন সেই ঘটনা ,"পুন্যস্মৃতি ' তে জানিয়েছেন' এক মান্দ্রাজি জমিদার কি রকম ভাবে তাঁহাকে কন্যাদান করিবার চেষ্টায় ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন ,সে গল্প শুনিলাম। গল্প শেষ করিয়া বলিলেন, ,'সে বিয়ে যদি করতুম তা হলে আর আজ কাছে দাঁড়াতে পারতে? সাত লাখ টাকা আয়ের জমিদারির মালিক হয়ে, কানে হীরের কুণ্ডল পরে, মান্দ্রাজে বসে থাকতুম ,তা না এখন two ends meet করতে পারিনে ,বসে বসে কবিতা লিখছি। '

সাত লাখ টাকার উত্তরাধিকারিণীকে 'মদ্রজা' কে যে ঠাকুরবাড়ির কেউ পছন্দ করেন নি , রবীন্দ্রনাথের বড় দা  দ্বিজেন্দ্রনাথের বহুপঠিত কবিতাটি তার প্রমাণ :
                        ---' অনিন্দিতা স্বর্ণ- মৃণালিনী হোক
                          সুবর্ণ তুলির তব পুরস্কার। মদ্রজার কারে
                           যে পড়ে  সে পড়ুক খাইয়া চোক। '
এ কবিতা লেখা হয় যে বছর অগ্রহায়ণ মাসে রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিল ,সেই বছরেরই  জৈষ্ঠ মাসে।  

রবীন্দ্রনাথের দৌহিত্রী নন্দিতার স্বামী কৃষ্ণ কৃপালনী রবীন্দ্রজীবনী লেখার সময়ে মাদ্রাজের মেয়ের পরিবর্তে ওড়িশার একটি মেয়ের উল্লেখ করেছেন।

ওড়িশায় ঠাকুর বংশের জমিদারী ছিল ,কাজেই সেখানকার আর এক জমিদার সুদর্শন কবিকে জামাতা করতে চাইলে অবাক হবার কিছু নেই।  তিনি আরও লিখেছেন,জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ দুই ভাই মিলে  রাজবাড়িতে  মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। তবে এর থেকে আর বিশেষ কিছু জানা যায় নি এই বিবাহের সম্বন্ধের ব্যাপারে।

অপরদিকে আসামের জমিদার জানদাভিরামের  আত্মজীবনী 'মোর কথা ' থেকে পাচ্ছি একটি খেদোক্তি। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ,'ভগবানের কি ইচ্ছা ! কবি-গুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বড় দিদির বিয়ে হলো না, কিন্তু বড় দিদির ছোট ভাই আমার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞ দার্শনিক বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের মেজ ছেলে অরুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠা কন্যা লতিকা দেবীর বিয়ে হয় ১৯০৬ সালের ১লা জুলাই। মানুষের মতের কত পরিবর্তন হয়।  এই বিয়ে আবার বড়দিদি স্বর্ণলতা দেবী ই দিয়েছিলেন। তার পর ঠাকুরবাড়িতে কত বিধবা বিবাহ হচ্ছে। '  ঊষারঞ্জন  ভট্টাচার্য মহাশয় তাঁর 'রবীন্দ্রনাথ ও অসম ' গ্রন্থে জ্জানদাভিরামের এই উক্তি অবলম্বন করেই জানিয়েছেন , 'জ্জানদাভিরামের রচনা ' 'মোর কথা' থেকে জানা যায় তাঁর দিদি স্বর্ণলতা দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ-সম্বন্ধ হয়েছিল। 

কিন্তু দেবেন্দ্রনাথ যখন জানলেন যে এই সুন্দরী ও সুশীলা   পাত্রীটি  বিধবা তখন আর এগোতে রাজী হলেন না।  কবির সঙ্গে জ্জানদাভিরামের হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ,ফলে কবি তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে বহুবার কৌতুক করেছেন।  শুধু তাই নয় 'ছবি তোলার প্রস্তাব হতেই কবি কৌতুকের সুরে ইরাকে বললেন, তোর পিসিকে তো পাইনি ,তুই কাছে থাকলে ছবি তোলায় আপত্তি নেই.' লিখেছেন শ্রী ভট্টাচার্য। 

এবারে প্রশ্ন , রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে স্বর্ণলতার বিবাহ সম্বন্ধ কবে উঠেছিল ? শ্রী ভট্টাচার্যের মতে, দেবেন্দ্রনাথের প্রাথমিক অনুমোদন থাকলেও পাত্রী বিধবা বলে তিনি পরে আপত্তি জানান। কিন্তু লক্ষীনাথ বেজবরুয়ার তাঁর জীবনস্মৃতিতে জানিয়েছেন, স্বর্ণলতা বিধবা হন ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ৩১সে মার্চ আর তাঁর পুনর্বিবাহ হয় ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই ফেব্রুয়ারি।  লক্ষিনাথ ছিলেন বিয়ের অন্যতম সাক্ষী।  তা ছাড়া এই সময়ে কবিপত্নী জীবিত ছিলেন ,রবীন্দ্রজীবনে তিনি এসেছিলেন ১৮৮৩ সালের ৯ই ডিসেম্বর ,বিদায় নিয়েছিলেন ১৯০২ সালের ২৩সে নভেম্বর। তাহলে? 

ইরা জানিয়েছেন, এর প্রতিটি ঘটনাই সত্যি। তবে স্বর্ণলতার সঙ্গে কবির বিয়ের কথা হয়েছিল ১৮৮৩ সালের কোনও এক সময়ে,তখন স্বর্ণলতার একবারও বিয়ে হয় নি।  রায়বাহাদুর গুণাভিরাম বরুয়া ছিলেন উদারহৃদয় ব্যক্তি ,'আসামবন্ধু ' র প্রতিষ্ঠাতা -সম্পাদক। সুকিয়া স্ট্রীটের অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদ্যোগে বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। ১৮৯৯ সালে ব্রাহ্মধর্মে  দীক্ষিত  হয়েছিলেন। স্ত্রী ব্রজসুন্দরীর অকাল প্রয়াণের পরে তিনি দুই সন্তানের জননী বিষ্ণুপ্রিয়াকে বিবাহ  করেন।  

স্বর্ণলতা এঁদেরই কন্যা। অত্যন্ত রূপসী স্বর্ণলতা বেথুন স্কুলে পড়তেন ও পরবর্তীকালে লেখিকা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁকেই প্রথম মহিলা সাংবাদিকের মর্যাদা দেওয়া হয়।  ষোলো বছর ধরে তিনি এসোসিয়েটেড প্রেসে সংবাদ সরবরাহ করেন। ঠাকুরবাড়ির উতসবে তিনি পিতা গুণাভিরামের বরুয়ার সঙ্গে এসেছিলেন এবং তখনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বিবাহ-সম্বন্ধ হয়।  এই প্রস্তাবে কবির অনুমোদন ছিল , হয়ত সেই সম্ভাবনাতেই দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথ খুশি হয়ে কবিতায় লিখেছিলেন ' অনিন্দিতা স্বর্ণ- মৃণালিনী হোক সুবর্ণ তুলির তব পুরস্কার। 'কিন্তু অনুসন্ধানের পরে মহর্ষি যখন শুনলেন , স্বর্ণলতা বিধবার সন্তান তখন সম্বন্ধ ভেঙে যায়।

স্বর্ণলতার সঙ্গে কবির বিবাহ প্রস্তাবটির কথা কেউ কখনও বলেননি, সম্ভবত কবি নিজে তা সংগোপনে রেখেছিলেন বলে।  পরে শুধু জ্জানদাভিরাম ও তাঁর মেয়ে ইরার সঙ্গে এ নিয়ে কৌতুকের সুরে কথা বলতে শোনা গিয়েছে। যে সময়ে তিনি ইরাকে তার পিসির কথা তুলে ঠাট্টা করেছেন ,মনে রাখতে হবে ,তখন স্বর্ণলতাও আর ইহলোকে নেই. তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৩২ সালে। জ্জানদাভিরাম তাঁর দিদিকে খুব ভালবাসতেন ,তাই সেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ের সঙ্গে যখন তাঁর বিয়ে হল ,তখন দিদির বিয়ে না হওয়ার কথাটি বিশেষ করে মনে পড়েছিল।  আসলে ঠাকুরবাড়িতে মহর্ষি বিধবা বিবাহের বিপক্ষে থাকায় জ্জানদাভিরামের সঙ্গে লতিকার বিয়ে হয় মহর্ষির মৃত্যুর পরে। স্বর্ণলতার আগ্রহেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ে  লতিকা বরুয়া  পরিবারে বধূ হয়ে আসেন।

পূর্বোল্লিখিত দুইটি পাত্রী দেখার সম্ভাবনা নাকচ হবার পরে  রবীন্দ্রনাথের বিবাহ নিয়ে তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল।তখন বাড়ির অভিভাবকেরা এই বঙ্গের উপযুক্ত জায়গা থেকে পাত্রী দেখার সিদ্ধান্ত নেন।   অবনীন্দ্রনাথের ঘরোয়া বইটিতে তাঁর স্মৃতিকথায় তিনি লেখেন, 'রবিকাকার বিয়ে আর হয় না; সবাই বলেন,বিয়ে করো -বিয়ে করো এবারে, রবিকাকা রাজি হন না, চুপ করে ঘাড় হেঁট করে থাকেন।  শেষে তাঁকে তো সবাই মাইল বুঝিয়ে রাজি করালেন। ' এ ব্যাপারে মহর্ষির নিশ্চয়ই কিছু চাপ ছিল এবং সেজন্যে তিনি সেপ্টেম্বর মাসে কবিকে মুসৌরিতে ডেকে পাঠান।  রবীন্দ্রনাথ মুসৌরিতে যাবার কিছুদিন পরেই তাঁর বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয় এবং সেরেস্তার কর্মচারী অভয় চরণ ঘোষকে যশোরে পাঠানোর সংবাদ পাওয়া যায়।  কিন্তু তাতে তেমন কোনো খোঁজ খবর না পাওয়াতে রবীন্দ্রনাথের বৌদিরা দলবেধে মেয়ে দেখতে যান যশোর খুলনাতে।  

এই মেয়ে দেখার দলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কি না, সেই বিষয় নিয়ে মতান্তর আছে. রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন তিনি কনে দেখতে যান নি ,কিন্তু ইন্দিরা দেবী চৌধারিণী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন কনে দেখার দলে তাঁর 'রবিকাকা' -ও  ছিলেন। অবশ্য দু'জনেই তাঁদের শেষ জীবনে স্মৃতিচারণ করেছেন-কারো একজনের বিভ্রম ঘটা অস্বাভাবিক নয়।  কবির বৌঠানেরা অর্থাত জ্জানদানন্দিনী দেবী, কাদম্বরী দেবী , জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, বালক সুরেন্দ্রনাথ ও বালিকা ইন্দিরা ও সঙ্গে একুশ বাইশ বছরের নব যৌবনের কবিকে নিয়ে পাত্রীর সন্ধানে জ্জানদানন্দিনী দেবীর বাপের বাড়ি নরেন্দ্রপুর গ্রামে আশ্রয় নেন।  ইন্দিরা দেবীর মামার বাড়ি  মাটির বাড়ি, খড়ের চাল, উঁচু  রোযাক।  মাটির আঙিনা।  আশেপাশে বাগান-পুকুর। 

এখানেই বালিকা ইন্দিরা তাঁর জ্যোতিকাকা ও রবি কাকার কাছে  ঘড়ি-দেখা শিখলেন। মা-কাকীরা পাত্রী খুঁজতে এ-পাড়া  ও-পাড়া যান, আর দুই কাকা বাড়িতে শিশুদের সঙ্গ দেন. প্রায়ই তাঁরা রবীন্দ্রনাথের জন্যে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে কনে দেখতে গেলেও ,তাঁদের পছন্দমত একটি সুন্দরী পাত্রীও খুঁজে পেলেন না।  যশোরে পিরালী ব্রাহ্মণদের একটা আড্ডা ছিল,তাই জোড়া সাঁকোর  বৌয়েরা  অধিকাংশ সেখান থেকেই আসতো।  তাদের সুন্দরী  বলে একটা নাম ছিল. কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেলায় নির্বাচক মন্ডলীর কাছে কোনো সুন্দরী নজরে পড়ল না।  দক্ষিণ ডিহি ,চেঙট প্রভৃতি সব পাড়া খুঁজেও মনের মত মেয়ে পেলেন না।  অবশেষে খুলনা জেলার দক্ষিণে ডিহি ফুলতলা গ্রামের বেনীমাধব রায়্চৌধুরীর একমাত্র কন্যা ফুলি ওরফে   ভবতারিণী কে  মনোনীত করা হলো।  

শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ নিজেও পাত্রীকে মনোনীত করেছিলেন। তবে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।  রবীন্দ্রজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল মন্তব্য করেছিলেন, ' রবীন্দ্রনাথ স্বেচ্ছায় একটি দশ বছরের কম প্রায় অশিক্ষিতা মেয়েকে ভাবী জীবনসঙ্গিনী  মনোনীত করবেন একথা বিশ্বাস করা কঠিন।' ভবতারিণীর গাত্রবর্ণ শ্যামলা ছিল এবং তাঁকে সুন্দরী বলা চলে না।  কবি কনের এই শ্যামলা রংটিকেই পছন্দ করেছিলেন। পরে কবিতায় সেই ভাব প্রকাশ করেছিলেন এই ভাবে, 'যে দেখায় সে আমার মন ভুলিয়েছে / তাতে আছে যেন এই মাটির শ্যামল অঞ্জন ,/ ওর কচি  ধানের চিকণ আভা। ' বিবাহের সময় ভবতারিণীর বয়স ছিল নয় বছর নয় মাস, জন্মতারিখ ১লা মার্চ,১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ। কবি কনের পিতৃগৃহের  পরিচয় অথবা কনে দেখার বিবরণ কাউকেই বলেননি ,কিন্তু পরিহাসছলে বলে গেছেন শাশুরির ১০৮ পদ রান্নার কাহিনীটি। আর কাব্যে উপন্যাসে কনের পিতৃ গৃহের পরিচয় ও গ্রাম্য পথের বিবরণ লিখে গেছেন।  'ধরাতলে দীনতম ঘরে/ যদি জন্মে প্রেয়সী আমার ,নদীতীরে / কোন -এক গ্রাম্ প্রান্তে প্রচ্ছন্ন কুটিরে / অশ্বত্থ ছায়ায় ,সে বালিকাবক্ষে  তার / রাখিবে সঞ্চয় করি সুধার ভান্ডার / আমারি লাগিয়া সযতনে। ' অর্থাত ফুলতলি গ্রামের প্রান্তদেশে নদীর ধারে অশ্বত্থ  গাছের ছায়ায় যে কুটির রয়েছে ,সেই দীনতম ঘরের বালিকাকেই কবি দেখতে গিয়েছিলেন।


ইন্দিরা দেবী তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে যশুরে মেয়েদের মধ্যে সাধারণ গুণের ও  তাঁদের মিশুকে ও পরকে আপন  করার ক্ষমতা ভবতারিনীর মধ্যে পূর্ণভাবে প্রকাশিত হতে দেখেছিলেন। আর তাঁর রবিকাকার এই অসম বিবাহের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, 'রবিকাকার মত অমন গুণবান ,রূপবান ,ভাগ্যবান, ধনবান, খ্যাতিমান (ভবিষ্যতের মত না হলেও যথেষ্ট ) যুবাপুরুষ , গুরুজনেরা যে মেয়েকে হাতে তুলে দিলেন , বিনা বাক্যব্যয়ে নির্বিবাদে কী করে তাকেই বিয়ে করতে রাজি হলেন ও পরে সুখে স্বচ্ছন্দে ঘর করতে লাগলেন, ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়।  অথচ আজকাল কত কথা শোনা যায় যে ,স্ত্রী শিক্ষিতা নাহলে শিক্ষিত স্বামীর সঙ্গে মিশ  খাবে কী করে ইত্যাদি। সেকালে ওঁদের  স্ত্রীরা সে হিসাবে কে-ই বা স্বামীর উপযুক্ত ছিলেন ? অথচ ওঁরা সর্বদা তাঁদের  যথেষ্ট মেনে চলতেন, গৃহলক্ষীর সম্মান দিতেন।'

কনে দেখার পালা সঙ্গ করে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ  তাঁর স্ত্রী কাদম্বরী দেবী , দিদি সৌদামিনী , জ্ঞানদানন্দিনী  দেবী ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মস্থল বম্বের কারোয়ারে যান।  কারোয়ার থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ,কাদম্বরী দেবী ও রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতায় ফিরে আসার পরেই রবীন্দ্রনাথের বিবাহের আয়োজন শুরু হয়ে যায়।  এরই ফলশ্রুতি স্বরূপ ১৮৮৩ খ্রীস্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর  বিবাহের দিন ধার্য হয়।  তবে এই বিবাহে জ্জানদানন্দিনী দেবী ও সৌদামিনী দেবী কারয়ারে থেকে যাওয়ায় বিবাহে অনুপস্থিত ছিলেন। ঠিক এই সময়ে আকস্মিক সৌদামিনী দেবীর স্বামী শ্রী সরদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়ে   বিবাহ বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে।  অন্যদিকে প্রথমে উতসাহ ও উদ্দেপনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের অতি  প্রিয় নতুন বৌঠান পাত্রী দেখতে গেলেও , কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বিবাহ  সমারোহে  যোগ দেন নি।  এই সব কারণে কবি   নিজেকে অনাদৃত বলে উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় অত্যন্ত সাধারণ ভাবে।  কোনো জাঁকজমক হয় নি।  

অথচ রবীন্দ্রনাথ শৈশব থেকেই এই বিশেষ দিনটির স্বপ্ন দেখতেন। কারণ শৈশবে কৈলাশ মুকুজ্জের সালঙ্কারা বধূর বিবাহের উতসবের বর্ণনা বালক বয়সে শুনেই সেটিকেই যুবক রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ের গোপন লালন করে এসেছিলেন। তাই তাঁর বিবাহ জাঁক -জমকের  সঙ্গে হয়নি বলে চিরকাল কবির মনে আক্ষেপ  ছিল।  সেই আক্ষেপ মাঝে মাঝে আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রকাশ করতেন। সেজন্যে মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীকে বিয়ের ব্যাপারে বলেছিলেন,  'আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই।  --- নিজের বিয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই, সে কথা উত্থাপণ মাত্র হেসে উড়িয়ে দেবে ,অথচ পরের বিয়ের পদ্য লেখ।'  কবির মনের এই গোপন আকাঙ্খা তাঁর আকাশ প্রদীপ কাব্যের 'বধূ'  কবিতায় সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন।তবে কবির ইচ্ছামত পাত্রী ভবতারিণীকে  জোড়া সাঁকোতে  সুসজ্জিত করে এনে বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়।

 তবুও আনন্দের সঙ্গে  রবীন্দ্রনাথ নিজের বিবাহের এক অভিনব নিমন্ত্রণপত্র নিজের হাতে লিখে প্রিয় বন্ধু প্রিয়নাথ সেন ও অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবকে পাঠিয়েছিলেন।  এই পত্রটির মাথায় ভোরের পাখির প্রথম আবির্ভাবের সঙ্গে  সূর্যোদয়ের ছবির নীচে মধুসূদন দত্তের কবিতা 'আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হয়' -লিখে তারই পাশে লিখলেন  ' আমার Motto নহে। '

প্রিয় বাবু,
              আগামী রবিবার ২৪ অগ্রহায়ণ  তারিখে শুভদিনে শুভলগ্নে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ বিবাহ হইবেক। আপনি তদুপলক্ষে বৈকালে উক্ত দিবসে ৬নং জোড়াসাঁকোস্থ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভবনে উপস্থিত থাকিয়া বিবাহদি  সন্দর্শন করিয়া আমাকে এবং আত্মীযবর্গকে বাধিত করিবেন।
                                    ইতি
                                         অনুগত
                                শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 একটি সূত্রে জানা যায় , রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভবতারিণীর  বিবাহের ঘটকালি করেন কবির মাতুল ব্রজেন্দ্রনাথ রায়ের পিসিমা আদ্যাসুন্দরী  দেবী। প্রচলিত ঠাকুরবাড়ির রীতি অনুসারে রবীন্দ্রনাথের আইবুড়ো  ভাত অবনীন্দ্রনাথের  বাড়িতেই হয়।  অবনীন্দ্রনাথের মা রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী ভবতারিণীর সম্পর্কে বোন হন ,তাই তিনি  এই বিবাহে খুব খুশী হয়েছিলেন। 

অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায় আছে- 

'মা গায়ে হলুদের পরে রবিকাকাকে আইবুড়ো ভাতে নেমন্তন্ন করলেন।অবনীন্দ্রনাথের বড় পিসিমা কাদম্বিনী  দেবীর ঘরে আইবুড়ো ভাত সাজানো হয়। মা খুব খুশি,ভবতারিণী একে যশোরের মেয়ে তায় সম্পর্কে বোন। বিরাট আয়োজন।পিসিমারা রবিকাকাকে ঘিরে বসেছেন ,এ আমাদের নিজের চোখে দেখা।  রবিকাকা  দৌড়দার শাল গায়ে, লাল কি সবুজ রঙের মনে নেই তবে   খুব জমকালো রঙ চঙের।  বুঝে দেখো, একে রবিকাকা , তায়  ওই  সাজ ,দেখাচ্ছে যেন দিল্লীর বাদশা! তখনই ওঁর কবি বলে খ্যাতি ,পিসিমারা জিজ্ঞাসা করছেন ,কি রে, বউ দেখেছিস ,পছন্দ হয়েছে ,কেমন হবে বউ ইত্যাদি সব।  রবিকাকা ঘাড় হেঁট করে বসে একটু একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছেন,আর লজ্জায় মুখে কথাটি নেই।'

কবি নিজের বিবাহের গল্প কারো কাছে করেন নি কিন্তু কবিতায় টুকরো টুকরো ভাবে বিবাহের স্মৃতি কথা লিখে গেছেন যেমন-'ক্ষণিক মিলনের' দুইখানি দিশেহারা মেঘের বর্ণনার পিছনে রবীন্দ্র মৃণালিনীর অকস্মাত বা  দৈব ঘটিত মিলন কাহিনী যা কাব্যে বহুবার  হয়েছে। সানাই-এর 'হঠাত মিলন' বা অকস্মাত (দৈব ) মিলনের ওড়না ঢাকা মুখের একটুখানি হাসির ঝিলিকের স্মৃতি এবং শেষ সপ্তকের উনত্রিশ সংখ্যক কবিতায় বিবাহের 'অনেক কালের একটি   মাত্র দিনের' স্মৃতির  সঙ্গে  ধূপছায়া রঙের বেনারসী সাড়ী পরিহিতা, খোপাটি ছাড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া  দন্ডায়মানা বালিকা বধূর আগমনের সঙ্গে  উতসবের সানাই-এর বসন্ত পঞ্চম রাগের স্মৃতি কাব্যে লিখে গেছেন। কবির এই টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলোকেই একত্রিত করলেই কবির বিবাহের সুন্দর ছবি আপনিই ফুটে ওঠে।  কবির কথায় - 'বিবাহের প্রথম বতসরে /দিকে দিগন্তরে /সহানায়  বেজেছিল বাঁশি /উঠেছিল কল্লোলিত হাসি। '

এরপরে নিজেরই বাড়িতে পশ্চিমের বারান্দা ঘুরে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে এলেন অন্দরমহলে স্ত্রী আচারের সরঞ্জাম যেখানে সাজানো। বরসজ্জার  শাল খানি গায়ে জড়ানো রবীন্দ্রনাথ এসে দাঁড়ালেন পিড়ির উপর।  নতুন কাকিমার আত্মীয়া -যাঁকে সবাই ডাকতেন 'বড় গাঙ্গুলীর  স্ত্রী ' বলে -রবীন্দ্রনাথকে বরণ করলেন তিনি।  তাঁর পরনে ছিল একখানি কালো রঙের বেনারসী জরির ডুরে। বিয়ের সময় কাকিমা ছিলেন খুব রোগা। গ্রামের বালিকা ,শহুরে হাবভাব কিছুই জানতেন না।  কনে এনে সাতপাক ঘোরানো হলো -শেষে বরকনে দালানে চললেন সম্প্রদান স্থলে। বাড়ির অবিবাহিত মেয়েরাও সঙ্গে সঙ্গে  চলল।  আমিও জুটে  গেলুম  তাদের সঙ্গে। দালানের একধারে বসবার জায়গা ছিল আমাদের। দেখলুম সেখানে বসে  সচক্ষে কাকিমার সম্প্রদান।

রবীন্দ্রনাথের জীবনের এই বিরল মুহুর্তে উপস্থিত থাকতে পেরে আনন্দ উচ্ছ্বাসের অন্ত ছিল না অবনীন্দ্রনাথের। আবেগাপ্লুত কন্ঠে রানী চন্দকে বলেছিলেন, ' সে মূর্তি তোমরা আর দেখতে পারবে না, বুঝতে পারবে না বললে -এই আমরাই যা দেখে নিয়েছি।'

সম্প্রদানের পরে বরকনে এসে বাসরে বসলেন। রবীন্দ্রনাথের বউ এলে তাঁর থাকবার জন্যে একটি ঘর নির্দিষ্ট করা ছিল আগে থেকেই। বাসর বসলো সেই ঘরেই।বাসরঘরের সুন্দর বিবরণ পাওয়া যায় প্রত্যক্ষদর্শী হেমলতা দেবীর লেখায়:   'বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টুমি আরম্ভ করলেন। ভাঁড় কুলো  খেলা আরম্ভ হল।  ভাঁড়ের  চালগুলি ঢালাই -ভরাই হলো ভাঁড় খেলা। রবীন্দ্রনাথ ভাঁড় খেলার বদলে ভাঁড় গুলো উপুর করে দিতে লাগলো ধরে ধরে।  তাঁর ছোট কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী বলে উঠলেন, 'ওকি করিস রবি? এই বুঝি  তোর্ ভাঁড় খেলা? ভাঁড় গুলো সব উল্টে দিচ্ছিস কেন ?' রবীন্দ্রনাথের নিজের বাড়ি নিজেই বর।  তাঁকে শশুরবাড়ি যেতে হয় নি তাই তাঁর লজ্জা সংকোচের কারণ ছিল না. রবীন্দ্রনাথ বললেন, ' জানো না কাকিমা সব যে উলট  পালট হয়ে যাচ্ছে-কাজে কাজেই আমি ভাঁড়  গুলো  উলটে দিচ্ছি।' রবীন্দ্রনাথ বাক সিদ্ধ মানুষ ,কথায় তাঁকে হারাতে পারবে না কেউ।

এবারে বাসরে গান গাইবার পালা। কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী বরবেশী রবীন্দ্রনাথকে বললেন -"তুই একটা গান কর।  তোর  বাসরে আর কে গাইবে, তুই  এমন গাইয়ে থাকতে ? রবীন্দ্রনাথের কন্ঠস্বর তখন কি চমতকার ছিল,সে যারা না শুনেছে  বুঝতে পারবে না।  আমরা যে কানে শুনেছি সে আমাদের কম সৌভাগ্য নয়।  এখন সবই হারিয়ে গেছে,তবু যা পেয়েছি তাই রেখেছি মনে ধরে।  বাসরে গান জুড়ে দিলেন -

 আ- মরি লাবণ্যময়ী
       কে ও স্থির সৌদামিনী ,
পূর্ণিমা -জোছনা দিয়ে
       মার্জিত বদনখানি।
নেহারিয়া রূপ  হায়,
আঁখি না ফিরিতে চায় ,
অপ্সরা   কি বিদ্যাধরী
        কে রূপসী নাহি জানি।

এই গানটি রবীন্দ্রনাথের ন'দি স্বর্ণকুমারী দেবীর রচনা-'বসন্ত উতসব'-এর দ্বিতীয় অঙ্কের গান ।

দুষ্টুমি করে গাইতে লাগলেন কাকিমার দিকে তাকিয়ে। বেচারী কাকিমা (মৃণালিনী দেবী) রবীন্দ্রনাথের কান্ড দেখে জড়োসড়।  ওড়নায় মুখ ঢেকে মাথা হেঁট করে বসে আছেন। আরও একটা গান গেয়েছিলেন  -সেটা আমার স্মরণে নেই।  '

বিবাহ বাসরে ওড়না   ঢাকা একটুখানি হাসির স্মৃতি সানাই-এর 'হঠাত মিলনে' ধরে রেখেছেন কবি- 'আঁচল আড়ে দীপের মতো একটুখানি হাসি ,/ নিবিড় সুখের বেদন দেহে উঠছিল নিশ্বাসি। '

বিবাহের পরে  নববধূ ভবতারিণীর নাম পরিবর্তন করে মৃণালিনী রাখা হয়। এই নতুন নাম দেওয়ার পিছনে অনেকগুলি মত পাওয়া যায়।  একটিতে মৃণালিনী নামটি কবির প্রথম প্রিয়া কৈশরিকা (বীথিকা) নলিনীর নামানুসারে (আন্না তড়খড়) রাখা হয়েছে। ছেলেবেলা কথিকাতে কবি লিখেছেন যে মৃণালিনী নামটি তিনি নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়েই রেখেছিলেন। অন্য একটি মতানুসারে রবীন্দ্রনাথের মান্দ্রাজি পাত্রীকে নাকচ করে এবং সম্ভাব্য পাত্রী স্ব্রর্ণলতাকে দেখে খুসি  হয়ে রবীন্দ্রনাথের বড় দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'যৌতুক কি কৌতুক  ' কাব্যে  'অনিন্দিতা স্বর্ণ-মৃণালিনী হোক ' বলে যে আশীর্বাদ উচ্চারণ করেছিলেন ,তারই সূত্রে এই নাম পরিবর্তন করা  হয়েছিল।

রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় থেকে অনেকেই রবীন্দ্রনাথের পাত্রী নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।  কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মনে কোন সংশয় ছিল না।  তিনি আনন্দের সঙ্গেই তাঁর গ্রাম্য   বালিকা বধূকে প্রথম  দর্শনেই গান দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন- 'দাঁড়ায়েছ সংগীতের শতদল দলে।' (স্মরণ) 
বস্তুত বিবাহকালে বাংলাদেশের তরুণ এবং প্রতিভাবান এবং স্বনামধন্য ঘরের রূপবান সাহিত্যিকের যথার্থ দোসর বা সহধর্মিণী হবার মতো যোগ্যতা অত্যন্ত সাধারণ ঘরের গ্রাম্য মেয়ে ভবতারিণী দেবীর যে ছিল না তা অবশ্য স্বীকার্য। কিন্তু বিবাহের অনতিকাল পরেই রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য  সহৃদয় অভিভাবকত্বে তিনি কবি প্রেযসীরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।

Sunday, June 15, 2014

রবীন্দ্রনাথের সংসার যাত্রার কিছু খুঁটিনাটি


ভূমিকা
রবীন্দ্রনাথের সংসারযাত্রার কথা বলতে গেলে তাঁর বিবাহপর্ব থেকে শুরু করা দরকার। এই প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক  বর্তমান পত্রিকায় ২৪সে মে তারিখ থেকে  শ্রী পার্থসারথী চট্টোপাধ্যায় মহাশয় "কবির সংসার " শীর্ষক একটি কথিকা ধারাবাহিক ভাবে শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে চারটি পর্ব প্রকাশিত হয়ে গেছে। এই চারটি পর্বের মধ্যে প্রথম তিনটি পর্ব রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের সংসার যাত্রা নিয়ে লিখিত।  চতুর্থ পর্বে তিনি রবীন্দ্রনাথের বিবাহ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। এই ক্রমবিন্যাস আমার মন:পুত হয় নি। এই কথিকার বেশির ভাগই আমার এবং অধিকাংশ রবীন্দ্রানুরাগীদের পরিচিত। সেজন্যে এই কথিকার বিশেষ অপরিচিত অংশগুলি  নিয়ে এখানে আলোচনা ও উল্লেখ করবার ইচ্ছেতেই এই ব্লগের অবতারণা  ।   

শিলাইদহের প্রথম পর্বেই  একটি তথ্যগত ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে।  পার্থসারথীবাবু বাবু প্রথম পর্বে রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহে  প্রথম সবাইকে নিয়ে যাওয়ার সময় নিয়ে বলেছেন যে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশ অনুসারে বিবাহের দুই মাস পরেই তিনি সেখানে যান।  এখানে আমার কিছু বক্তব্য আছে।  ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয় যশোরের ফুলতলী গ্রামের ভবতারিণীর সাথে। ১৮৮৮ সালেই রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী  দেবীর দাম্পত্য জীবন পূর্ণতা লাভ করে গাজীপুরের নিভৃত নিবাসে।  বিবাহের প্রায় চার বছর   পরে   রবীন্দ্রনাথ স্ত্রী ও শিশুকন্যা বেলা সঙ্গে দাসী ভজিয়াকে নিয়ে  সর্বপ্রথম সুবৃহত ঠাকুর পরিবারের এবং সুবিশাল জোড়াসাঁকোর বাড়ির বাইরে গাজীপুরের   নিভৃত  নিবাসে দাম্পত্যজীবনের আনন্দ অনুভব করার সুযোগ পান। গাজীপুর থেকে  ফিরে আসার পারে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর ডিসেম্বর মাসে স্বামী ,পুত্র কন্যাসহ শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে ও পদ্মাবাক্ষে মৃণালিনী দেবী কিছুদিনের জন্যে বাস করেছিলেন। সুতরাং রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহে প্রথমবার বিয়ের দুই মাস বাদে যাওয়ার উল্লেখ সঠিক  মনে হয় না ।  তা ছাড়া স্বল্পকাল বিলাস প্রবাসের পর স্বদেশে ফেরার পরই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে শিলাইদহে জমিদারী দেখাশোনার ভার গ্রহণ  করেন।  সেটি আরও পরের ঘটনা। সেটি ১৮৯১ সালের ঘটনা। সেজন্যে পার্থাসারাথীবাবুর এই শিলাইদহে প্রথম যাওয়ার সময়ের উল্লেখ সম্বন্ধে সন্দেহ থাকিয়া যায়। এটির রেফারেন্স জানা জরুরি।

শিলাইদহ পর্ব -প্রথম ভাগ 


এবারে  শিলাইদহ পর্বের কবির সংসার্ পর্বের কথা নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।  পদ্মা ও গোড়াই নদীর সঙ্গমে বুনোপাড়ার  কাছে নীলকর সাহেবদের প্রাচীন কুঠিবাড়ি কিনেছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।  প্রাচীন কুঠিবাড়িটি   পদ্মায় বিলীন হয়ে গেলে নতুন কুঠি বাড়ি নির্মিত হয় ১৮৯২ সালে। নীলকরদের একজন ছিলেন বহুশ্রুত শেলি  সাহেব। তারই নামে শেলির  দহ - এই শেলির দহ থেকেই এলাকার নাম শিলাইদহ।  আদি নাম খোরশেদপুর।

 রথীন্দ্রনাথ তাঁর 'পিতৃ স্মৃতি' গ্রন্থে লিখেছেন, বাবা যখন আমাদের নিয়ে শিলাইদহে গেলেন তখন এই নীলকুঠি নেই -তার ধ্বংসাবশেষ আমরা দেখতুম নদীর ধারে বেড়াতে গেলে. বাংলাদেশে এসে পদ্মানদী খুব খামখেয়ালী স্বভাবের হয়ে গেছে. কখনো গা ঘেঁসে গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংশ করেছে ,আর অন্য পাড়ে নতুন পলি-পড়া উর্বরা জমি তৈরী করে দিচ্ছে. --- নীলকুঠির প্রতি পদ্মার অনেকদিন পর্যন্ত নজর যায় নি,হঠাত খেয়াল হলো, সেইদিকের পাড় ভাঙতে শুরু করলো. বাড়িসুদ্ধ নদীগর্ভে যাবে ভয়ে  বাড়িটা আগে থেকেই ভেঙে ফেলা হল. তার মালমশলা নিয়ে নদী থেকে খানিকটা দূরে আর একটা কাছারি ও কুঠিবাড়ি তৈরী করা হয়. আমরা যখন শিলাইদহে গেলুম-এই নতুন বাড়িতে বাস করতে লাগলাম. (এই কুঠিবাড়িটা এখনো আছে. শুনতে পাই,  সে দেশের বর্তমান সরকার সেই বাড়িটা  মিউজিয়াম করে রক্ষার ব্যবস্থা করেছেন.) কিন্তু আশ্চর্য, পুরানো কুঠিটা ভাঙা হল বটে, কিন্তু নদী বাগানের গেট পর্যন্ত এসে আবার ফিরে গেল. যতদিন আমরা শিলাইদহে ছিলুম সেই নীলকুঠির ভগ্নাবশেষ  অটুট  ছিল. 

পিতার কাছ থেকে জমিদারির কাজে শিলাইদহে যাওয়ার  আভাস পান রবীন্দ্রনাথ বক্সার থেকে লেখা এক চিঠি মারফত। চিঠিতে মহর্ষি পুত্রকে নির্দেশ দেন , 'এইক্ষণে তুমি জমিদারির কার্য পর্যবেক্ষণ করিবার জন্যে প্রস্তুত হও ,প্রথমে সদর কাছারিতে নিয়মিতরূপে বসিয়া সদর আমিনের নিকট হইতে জমাওয়াশীল বাকী ও জমাখরচ দেখিতে থাক এবং প্রতিদিনের আমদানি রপ্তানি পত্র সকল দেখিয়া তার সারমর্ম নোট্ করিয়া রাখো। প্রতি সপ্তাহে আমাকে রিপোর্ট দিলে উপযুক্ত মতে তোমাকে উপদেশ দিব এবং তোমার কার্যে  পারদর্শীতা  ও   বিচক্ষণতা আমার প্রতীতি হইলে আমি তোমাকে মফ:স্বলে থাকিয়া কার্য করিবার ভার অর্পণ করিব। '

পুত্রের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেতে পিতার বেশি সময় লাগে নি। স্বল্পকালের মধ্যেই মফ:স্বলে থাকিয়া কার্য করিবার দায়িত্ব পেলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বভাব যাঁর আসমানাদারি -তিনি করতে চললেন জমিদারি।  যিনি আকাশে  ফেলে তারা ধরেন,তাঁর মনে দ্বিধা উপস্থিত হয়েছিল , 'হয়ত আমি একাজ পারব না,হয়ত আমার কর্তব্য আমার কাছে অপ্রিয় হাতে পারে।----১৮৯১ সালে পিতার ফরমান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ জমিদারির কাজ দেখতে গিয়েছিলেন  শিলাইদহ ,সাজাদপুর ও পতিসর। শিলাইদহের কাছেই তিনটি মহাল-কয়া ,জানিপুর ও কুমারখালি।  কিছু দূরে ডাকুয়াখালের পান্টি মহাল -সেখানে কবি একবার  সাক্ষাত ' যমরাজের সঙ্গে একরকম 'হাউ -ডু - ইউ  -ডু করে' আসেন। স্মরণ করেন ' মৃত্যু যে ঠিক  আমাদের নেক্সট ডোর নেবার তা  এরকম ঘটনা না হলে সহজে মনে হয় না. '

সেদিন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে   ফিরে শিলাইদহ থেকে দুখানা চিঠি লেখেন-একটি ভ্রাতুষ্পুত্রী   ইন্দিরা দেবীকে ,অপরটি পত্নী মৃণালিনী  দেনীকে।

১৮৯২ সালের ২০ জুলাই তিনি ইন্দিরাকে জানান,' আজ এইমাত্র প্রাণটা যাবার জো  হয়েছিল।পান্টি থেকে শিলাইদহে যাচ্ছিলুম ,বেশ পাল পেয়েছিলুম ,খুব হু হু শব্দে চলে আসছিলুম।  বর্ষার নদী চারিদিকে থৈ থৈ করছে এবং হই হই শব্দে ঢেউ উঠছে, আমি মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছি এবং মাঝে মাঝে লেখাপড়া করছি। বেলা সাড়ে সময় গড়ুই  নদীর ব্রিজ দেখা গেল।  বোটের মাস্তুল ব্রিজে বাধবে কিনা   তাই নিয়ে মাঝিদের  মধ্যে  তর্ক  লেগে  গেল -ইতিমধ্যে বোট  ব্রিজের অভিমুখে  চলেছে।  তখন বোঝা গেল সামনে  একটি বিপদ উপস্থিত।  কিন্তু বেশিক্ষণ চিন্তা করবার সময় ছিল না ,দেখতে দেখতে বোট ব্রিজের উপর গিয়ে পড়ল।  মাস্তুল মুড় মুড় করে ক্রমেই কাত  হতে লাগলো  ,আমি হতবুদ্ধি মাল্লাদের ক্রমাগত বলছি -তোরা  এখান থেকে সর ,মাথায় মাস্তুল ভেঙ্গে মরবি নাকি ! এমন সময় আর একটি নৌকা  তাড়াতাড়ি এসে  আমাকে তুলে নিলে এবং রশি ধরে   আমাদের বোটটিকে টানতে লাগলো।  তপসি এবং আর একজন মাল্লা রশি দাঁতে কামড়ে সাতারে ডাঙায় উঠে টানতে লাগল; সেখানে আরও অনেক লোক জড়ো হয়ে বোট টেনে তুলল। সকলে ডাঙায় ভিড় করে এসে বলল ,'আল্লা বাঁচিয়ে দিয়েছেন,নইলে  বাঁচবার কোনো কথা ছিল না। '

সেদিন এই বিপদের কথা জানিয়ে পত্নী মৃণালিনী  দেবীকে তিনি লেখেন, ' ভাই ছুটি -আজ আর একটু হলেই আমার দফানিকেশ হয়েছিল। তরীর সঙ্গে দেহতরী আর একটু হলেই ডুবেছিল।  আজ সকালে পান্টি থেকে পাল তুলে আসছিলুম -গোড়াই  নদীর ব্রিজের নিচে এসে আমাদের বোটের মাস্তুল ব্রিজে আটকে গেল -সে ভয়ানক ব্যাপার -একদিকে স্রোতে বোটকে ঠেলছে আর একদিকে মাস্তুল ব্রিজে আটকে গেছে - মড়মড়  শব্দে মাস্তুল হেলতে লাগলো এবং একটা মহা সর্বনাশ হবার উপক্রম হলো।  এমন সময় একটা খেয়া নৌকা এসে আমাকে তুলে নিয়ে গেল এবং বোটের কাছি নিয়ে দুজন মাল্লা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতরে ডাঙায় গিয়ে টানতে লাগলো -ভাগ্যি সেই নৌকা এবং ডাঙায় অনেক লোক সেই সময় উপস্থিত ছিল তাই আমরা উদ্ধার পেলুম ,নইলে আমাদের বাঁচবার কোনও উপায় ছিল না- ব্রিজের নীচে জলের তোড় খুব ভয়ানক -জানিনে ,আমি সাঁতরে উঠতে পারতুম কিনা কিন্তু বোট নিশ্চয় ডুবত। '

কিন্তু এত  বড়  ঘটনার পারে কেউ কি সেই খেয়া নৌকার সামান্য মাঝিকে মনে রেখেছে যার অসামান্য প্রত্যুত্পন্নমতিত্বে  ও প্রচেষ্টায় রক্ষা পেয়েছিল রবীন্দ্রনাথের জীবন। সেদিন সম্ভবত সঙ্গে ছিল না কবির জলে-স্থলে বহু অভিযানের সঙ্গী গফুর মিঞা বা গফুর  বাবুর্চি।  এই গফুর বাবুর্চির কথা রয়েছে কবির পত্নীকে লেখা চিঠিতে। পদ্মা হাউসবোট থেকে ১৮৯৩ সালের ৭ই জুলাই তিনি মৃণালিনী দেবীকে লিখছেন ' কবিত্ব এবং সংসার এই দুটোর মধ্যে বনিবনাও আর হয়ে উঠলো না দেখছি. কবিত্বে এক পয়সা খরচা নেই (যদি না বই ছাপাতে যাই)আর সংসারটাতে পদে পদে ব্যয়বাহুল্য এবং তর্কবিতর্ক। এইরকম নানা চিন্তা করছি এবং খালের মধ্যে দিয়ে বোট টেনে নিয়ে যাচ্ছে -আকাশে ঘননীল মেঘ করেছে - ভিজে বাদলার বাতাস দিয়েছে ,সুরজ প্রায় অস্তমিত -পিঠে একখানি শাল চাপিয়ে জোড়া সাঁকোর  ছাত আমার সেই দুটো লম্বা কেদারা এবং সাতলা ভাজার কথা এক একবার মনে করছি। সাতলা ভাজা চুলোয় যাক রাত্রে রীতিমত আহার জুটলে বাঁচি। গফুর মিঞা নৌকার পিছন দিকে একটা ছোট উনুন জ্বালিয়ে কি একটা রন্ধন কার্যে নিযুক্ত আছে  মাঝে  মাঝে ঘিয়ে ভাজার চিড় বিড়  চিড় বিড়  শব্দ হচ্ছে -এবং নাসারন্ধ্রে একটা সুগন্ধ আসছে কিন্তু এক পশলা বৃষ্টি এলেই সমস্ত মাটি।'
কবিপত্নী জানতেন ,গফুর মিঞা শুধু একজন সামান্য বাবুর্চি  নন,কবির নদীপথে যাতায়াতে বহু বিপদের দু:সাহসী সঙ্গী। প্রয়োজনে তাঁর জন্যে জীবন বিসর্জন  করতেও কুন্ঠিত নন।

রথীন্দ্রনাথের পিতৃস্মৃতি গ্রন্থ থেকে শিলাইদহের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথা জানা যায়।   রথীন্দ্রনাথের কথায়, ' ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে আমি একবার একলা শিলাইদহে গিয়েছিলুম।  সেবারকার একটি ঘটনা বেশ মনে আছে-ঘটনাটি বেশ গল্প লেখার মত।  পুজোর পরেই বাবা শিলাইদহে গেলেন বোটে ,নদীর  থাকবেন বলে. কিন্তু  নদীর জল তেমন নামে নি ,বালির চর জাগে নি।  শুকনো চর খুঁজে বের করার জন্যে নদীর এপার অপার ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে -এমন সময় ঝড়ের লক্ষণ দেখা গেল। বাবা মাঝিদের বললেন একটি দহের মধ্যে বোট নিয়ে রাখতে।  কি ভাগ্যি সময় মত দহের মধ্যে আশ্রয় নেওয়া  হয়েছিল ,না হলে বিপদ ঘটত। দড়াদড়ি   দিয়ে ভালো করে নৌকা বাঁধার  পরেই ঝড় এল।  তিনদিন তিন রাত সাইক্লোনের ঝড়বৃষ্টি সমানে চলেছিল। আমরা যে দহের মধ্যে ঢুকেছিলাম ,দেখতে দেখতে চারিদিক  ছোট বড় নানারকম নৌকা এসে তার মধ্যে আশ্রয় নিল।  দহের মধ্যে ঢেউ আসতে পারে না -আমরা বেশ নিরাপদে আটঘাট বেঁধে সেখানে রইলুম।  বোটের জানলা দিয়ে দেখতাম নদীর খরস্রোতে রাশি রাশি ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ,ভাঙা নৌকার কাঠকুটো  জলের উপর দিয়ে  ভেসে চলেছে। বুঝতে পারলাম নদীর ধারের বহু গ্রামের সর্বনাশ হয়েছে ,খোলা নদীতে যত নৌকা ছিল ডুবে গেছে। তৃতীয় দিনের বিকেলবেলায় ঝড়ের প্রকোপ কমে গেল , বাবা আমাকে নিয়ে ডেকের  উপরে এসে বসলেন। হটাত তিনি মাঝিকে ডেকে বললেন ,'দেখো তো ,মাঝ নদীর জলে কী যেন ভেসে যাচ্ছে? চুলের মত মনে হচ্ছে ,মেয়েমানুষের চুলের গোছাই হবে . যা, শীঘ্র জলিবোটটা নিয়ে যা।'  তুফান দেখে মাঝি সাহস করে নাম  না. বাবা তখন নিজেই নামার উদ্যোগ করছেন -এমন সময় পিছন থেকে ছুটে এসে বাবাকে সরিয়ে দিয়ে গফুর বাবুর্চি ছোট বোটটাতে লাফিয়ে পড়ল এবং উত্তম মধ্যম গালাগালি দিতে দিতে  মাঝিদের  টেনে নামিয়ে বোট ভাসিয়ে দিল।  আমরা শংকিত ভাবে দেখতে লাগলাম ,বোটটা সময়মত মজ্জমান  স্ত্রীলোকটির কাছে পৌঁছতে পারে  কিনা।  মাঝিরা ঘন ঘন দাঁড় ফেলছে ঢেউয়ের উপর-আছাড় খেতে খেতে বোট ছুটে চলেছে ,তবু যেন তাঁর কাছে পৌঁছতে পারছে না. অন্ধকার হয়ে  এল -আর কিছু দেখা যায় না ,কেবল গফুর মিঞার হাঁক ডাক মাঝে মাঝে কানে আসে।  অনেকক্ষণ পর বোট ফিরে এলো ,বাবুর্চির তখন কী উল্লাস -'মিল গিয়া, বাবুজি ,মিল গিয়া!' শোনা গেল মেয়েটি কিছুতেই বোটে উঠতে চায় নি,চুল ধরে কোনরকমে তাকে বোটে তোলা হয়েছিল। বাবা দেখলেন -একটি যুবতী স্ত্রীলোক্ সুন্দর তার চেহারা ,বোটের এক কোণে জড় সড় হয়ে বসে আছে. অনেক কষ্টে তার কাছ থেকে তার পরিচয় বার করতে পারলেন। শিলাইদহের কাছেই তার বাড়ি ,স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে ,কিন্তু  সাঁতার জানত বলে ডুবতে পারে নি.
বাবা তার শ্বশুরকে চিনতেন,তাকে ডেকে পাঠিয়ে বৌকে   নিয়ে যেতে বললেন।  ছেলেকে শাসন করে দিতেও বললেন ,যাতে এরকম ঘটনা আর না হয়।  শুনতে পাই পরে স্বামী -স্ত্রীর মধ্যে আর ঝগড়া হয় নি-পরম সুখে তারা সংসার করেছে। 

 এই গফুর বাবুর্চির অসম সাহসিকতার কথা আর একবার শোনা গেছে রবীন্দ্রনাথের সপরিবারে ১৮৮৯ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বর -ডিসেম্বর মাসের শিলাইদহে বাস করার সময়ে। সেবারে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী, পুত্র কন্যা সহ ছিলেন ভাইপ বলেন্দ্রনাথ ও বান্ধবী আমলা দাশ।  এখানে থাকাকালীন মৃণালিনী দেবী বান্ধবী আমলা দাশ ও ভাসুর পুত্র বলেন্দ্রনাথ বলেন্দ্রনাথ পদ্মার চরে বেড়াতে গিয়ে হারিয়ে যান. এই হারিয়ে যাওয়ার একাধারে উপভোগ্য ও অন্যদিকে উদ্বেগজনক বিবরণ রবীন্দ্রনাথ তার ছিন্নপত্রাবলীর তিন নম্বর পত্রে ও বলেন্দ্রনাথের 'পারিবারিক খাতা'য় সুন্দর ভাবে ধরে রাখা আছে।
শীতের পদ্মার বিস্তীর্ণ চরে বেলাশেষে  কুয়াশা নামে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে মৃণালিনী দেবীরা দিগভ্রান্ত হন।  পথ হারিয়ে  গভীর বিপদের মুখোমুখি।পদ্মার চরে ঝুপ করে নেমে আসা অন্ধকারে বলেন্দ্রনাথ দ্রুত পা চালাতে গিয়ে পাঁকের মধ্যে পড়েন।  কোনোমতে জুতো শুদ্ধ পা তুলে হাঁটবার চেষ্টা করে কাকিমাকে পরামর্শ দেন ছোটবার। সে সব কথায় কান না দেওয়াতে মতবিরোধ  শুরু হলো। সবাই তখন বালি   সমুদ্রের মধ্যে। চারিদিকে শুধু ধু ধু করছে বালি। প্রথমটা পথ হারানো বুঝতে পেরেও কেউ নিরাশ হয়ে পড়েন ভেবে কাউকে কিছু স্বীকার করলেন না বলেন্দ্রনাথ। শেষকালে  সব  বলে কাকিমাকে বোঝানো হলো যে, একটা উঁচু জমিতে   উঠলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কাকিমা মন্দ হাঁটতে পারেন না , তিনি রাজী হলেও তাঁর সহচরী খুব গোলযোগ তুললেন। শোনা গেল তাঁর নাকি গা হাত পা হিম হয়ে আসছে ,চলবার সামর্থ্য নেই ইত্যাদি। এরকম বিপদের মধ্যেও মাথা ঠিক রেখে পাঁক  ভর্তি ডোবা থেকে জল সংগ্রহ করে কাকিমার হাত দিয়ে সহচরীকে খাওয়ানো হলো, সহচরীর মূর্চ্ছা বাঁচানো গেল।  তারপরে বলেন্দ্রনাথ গফুর , আলো ,আলো করে চিত্কার শুরু করে দিলেন। মানুষ থাকলে তবে তো লোকে সারা দেবে। কেবল  প্রতিধ্ব্বনি শোনা যেতে লাগলো।  অনেক বলার পরে সবাই মিলে একটি উঁচু জায়গাতে উঠে লোকের আওয়াজ শোনা গেল।  হেঁকে ডেকে অনেক করে শেষে  একদল মেছোদের  কল্যাণে   পথ পাওয়া গেল।

এবারে এই ঘটনাতে রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রাবলীতে তাঁর উদ্বেগের বিশেষ উল্লেখ করে তার বিবরণ শোনা যাক।
গতকল্য এই মায়াউপকূলে অনেক ক্ষণ বিচরণ করে বোটে ফিরে গিয়ে দেখি -ছেলেরা ছাড়া আমাদের দলের কেউ ফিরেন নি. একবার ভাবলাম ডেকে পাঠাই ,কিন্তু স্বার্থ এবং দয়া উভয়ে একত্রে মিলে  আমাকে নিরস্ত করলে। অর্থাত , কতকটা নিজের  সুখ এবং কতকটা তাদের সুখের প্রতি দৃষ্টি করে আমি একখানি আরাম কেদারাতে স্থির হয়ে বসলাম -Animal Magnetism-নামক একখানা অত্যন্ত ঝাপসা বিষয়ের বই একখানি বাতির ঝাপসা আলোতে বসে পড়তে আরম্ভ করলুম।  কিন্তু কেউ আর ফেরেন না।
  --- বই খানাকে খাটের উপুড় করে রেখে বেরোলাম।  উপরে উঠে চার দিকে চেয়ে কালো মাথার কোনো চিহ্ন দেখতে পেলুম না- সমস্ত ফ্যাকাশে ধু ধু করছে। একবার বলু বলু পুরো জোরে চীত্কার করলুম -কন্ঠস্বর হু হু করতে করতে দশ দিক ছুটে গেল,কিন্তু কারও সাড়া পেলুম না ,তখন বুকটা হটাত সব  দিক থেকে দমে গেল, একখানা বড় খোলা ছাতা হটাত বন্ধ করে দিলে যেমনতর  হয়।  গফুর আলো নিয়ে বেরোলো ,প্রসন্ন বেরোলো ,বোটের মাঝিগুলো বেরোলো , সবাই ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন দিকে চললুম -আমি এক দিকে বলু বলু করে চীত্কার করছি-প্রসন্ন আর এক দিকে ডাক দিচ্ছে 'ছোটো মা'- মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে মাঝিরা 'বাবু বাবু' করে ফুকরে উঠছে।  সেই মরুভূমির মধ্যে নিস্তব্ধ রাত্রে অনেকগুলো আর্তস্বর উঠতে লাগলো। কারও সাড়াশব্দ নেই।  গফুর দুই এক বার দূর থেকে হেঁকে বললে 'দেখতে পেয়েছি' ,তার পরেই আবার সংশোধন করে বললে 'না' ' না' -আমার মানসিক অবস্থা একবার কল্পনা করে দেখ।  কল্পনা করতে গেলে নি:শব্দ রাত্রি ,ক্ষীণ চন্দ্রালোক,নির্জন নিস্তব্ধ শূন্য চর ,দূরে গফুরের চলনশীল লন্ঠনের আলো- মাঝে মাঝে এক দিক থেকে  কাতর  কন্ঠের আহবান  এবং চতুর্দিকে তার উদাস প্রতিধ্বনি- মাঝে মাঝে আশার  উন্মেষ এবং পরমুহুর্তেই সুগভীর নৈরাশ্য -এই সমস্তটা মনে আনতে হবে।    অসম্ভব রকমের আশঙ্কা সকল মনে জাগতে থাকলো। কখনও মনে হলো চোরাবালিতে পড়েছে ,কখনও মনে হলো বলুর হয়ত হটাত মূর্ছা কিংবা কিছু একটা হয়েছে ,কখনও বা নানাবিধ শ্বাপদ জন্তুর বিভীষিকা কল্পনায় উদয় হতে লাগলো। মনে মনে হতে লাগলো -'আত্মরক্ষা -অসমর্থ  যারা , নিশ্চিন্তে ঘটায়  বিপদ।' স্ত্রী- স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠলাম -বেশ বুঝতে পারলুম বলু বেচারা ভালোমানুষ ,দুই বন্ধনমুক্ত রমনীর পাল্লায় পড়ে বিপদে পড়েছে।  এমন সময় ঘন্টাখানেক পরে রব উঠলো এঁরা চর বেয়ে বেয়ে ওপারে গিয়ে পড়েছেন, আর ফিরতে পারছেন না. তখন ছুটে বোট অভিমুখে চললুম -বোটে গিয়ে পৌঁছতে অনেক ক্ষণ লাগলো। বোট ওপারে গেলে বোট লক্ষ্মী বোটে ফিরলেন -বলু বলতে লাগলো ,'তোমাদের নিয়ে আমি আর কখনও বেরোব না'। 'সকলেই অনুতপ্ত ,শ্রান্ত, কাতর ,সুতরাং আমার ভালো ভালো উপাদেয় ভর্ত্সনাবাক্য হৃদয়েই রয়ে গেল- পরদিন প্রাত:কালে উঠেও কোনমতেই রাগাতে পারলুম না।  সুতরাং এত বড় একটা ব্যাপার পরস্পর হেসেই উড়িয়ে দিলে ,যেন ভারী একটা তামাশা হচ্ছিল।     এই বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে এই ঘটনা রবীন্দ্রনাথকে কতটা বিচলিত করে তাঁর দুর্ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মানুষ  রবীন্দ্রনাথের এ এক  উপভোগ্য চিত্র। এই ঘটনার স্মৃতি নিয়েই মূলত 'নৌকাডুবি ' উপন্যাসের পটভূমি তৈরী  হয়েছিল মনে।
 পরবর্তীকালে এই শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে বাস ও বাগানের পুকুর ঘাট ও স্নানরতা ও ষোলো বছরের রন্ধন পটিয়সী সুগৃহিণী মৃণালিনী দেবী ও উনত্রিশ বছরের রোম্যান্টিক কবি স্মৃতিচারণা করে বৃদ্ধ বয়সে চিঠির মারফত অতীতকে ধরে রেখেছেন বীথিকা কাব্যের  'নিমন্ত্রণ ' কবিতাতে। যেখানে কবি পূর্বের মত মৃণালিনী দেবীকে নানারকম মিষ্টির ফরমাশ দিচ্ছেন।  আর মৃণালিনী দেবীর হিসাবের খাতা ও ফেলে যাওয়া আধুলির প্রতি নির্দেশ করে কালের ও মৃনালিনী দেবীর আর্থিক সঙ্গতি ও হিসাবী মনোভাবের ছবি এঁকেছেন। কবি বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর প্রিয় স্থান শিলাইদহে কিছুদিনের জন্যে বাস করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বার্ধক্য হেতু তিনি শিলাইদহের কুঠিবাড়ির পরিবর্তে গঙ্গার ধারে 'পদ্মা' বোটে চন্দন নগরে বাস করে চিঠির মারফত অতীতের শিলাইদহের কুঠিবাড়ি ও বাগানের পুকুর ঘাটের স্মৃতিচারণা করেছেন। রবীন্দ্রজীবনে মৃণালিনী দেবীকে চিঠি   লেখার এক বিশেষ ভূমিকা আছে,  বিশেষভাবে  যৌবনের প্রথম দিকের মানসী পর্বের চিঠিগুলিতে (১৮৮৮-১৮৯০)  . তাই কবি এই কালের অর্থাত ১৮৯৯ সালের শিলাইদহের কুঠিবাড়ি,বাগানের পুকুরঘাট ও ১৬ বছরের মৃণালিনী দেবী ও  উনত্রিশ বছরের কবিকে স্মরণ করে বৃদ্ধ বয়সে এই চিঠির অবতারণা।

শিলাইদহের প্রথম পর্ব এখানেই সমাপ্ত।